হরমুজ প্রণালি খোলা নিয়ে ইরানের নতুন বার্তা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে তার পরিবারসহ হত্যার পরও দেশটির ইসলামী শাসনতন্ত্রের অবসান ঘটাতে না পেরে টানা ৩৩ দিন ধরে একের পর এক নেতা ও কমান্ডারকে হত্যা করে চলেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। সেইসঙ্গে ধ্বংসের চেষ্টা চালানো হচ্ছে ইরানের জ্বালানি ও পারমাণবিক কর্মসূচিসহ গুরুত্বপূর্ণ সব স্থাপনাও। তবে, শক্ত জবাব দিয়ে চলেছে তেহরানও। ইসরায়েলের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনাগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সম্মিলনে ভয়ংকর সব হামলা চালিয়ে যাচ্ছে দেশটি। সব মিলিয়ে যতটা সহজে ইরানকে পরাস্ত করবেন বলে ভেবেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার সহযোগীরা, তেমনটা তো হচ্ছেই না; বরং ইরানের জবাবের সামনে মুখ থুবড়ে পড়ছে তাদের সব পরিকল্পনা। এরই মধ্যে ইরানের পক্ষে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুতি সশস্ত্র গোষ্ঠী। ইরানি বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে একযোগে শত্রুপক্ষের ওপর ভয়ংকর ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত হানছে তারা। একইসঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে বিশ্ব জুড়ে জ্বালানি সংকট সৃষ্টি করে ফেলেছে ইরান।বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ পথ খুলতে একের পর এক হুমকি ও হামলা চালিয়েও ইরানের অটল অবস্থানের সামনে অনেকটা অসহায় হয়ে পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার মিত্ররা। এরই মধ্যে ইরানে হামলার তীব্রতা আরও বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প। এ অবস্থায় তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল এবং তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের কোনও জাহাজকে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না হরমুজে। খবর বিবিসির।ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, বৈশ্বিক তেল পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালী সেই সব জাহাজের জন্য উন্মুক্ত রাখা হচ্ছে, যেগুলো ‘আগ্রাসীদের নয় এবং তাদের সঙ্গে সম্পর্কিতও নয়’।টিভি চ্যানেল নিউজরুম আফ্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাঘাই বলেছেন, ‘আমাদের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের পর’ জাহাজগুলোকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতের অনুমতি দেওয়া হবে।এছাড়া, এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কোনও ফাঁদে ইরান পা দেবে না বলেও জানিয়ে দিয়েছেন ইসমাইল বাঘাই।ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই মুখপাত্র বলেন, ‘যুদ্ধ, আলোচনার পর্ব, যুদ্ধবিরতি— এমন এক দুষ্টচক্র’ সহ্য করবে না ইরান। এসময় গত বছরের জুলাইয়ে সংঘটিত ১২ দিনের সংঘাতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বাঘাই বলেন, তারা বললো চলুন থামি, আমরা থামলাম; আর ৯ মাস পর তারা আবার (যুদ্ধ) শুরু করল।প্রসঙ্গত, ইরানের পরমাণু প্রকল্প এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে গত ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২১ দিন ধরে সংলাপ চলে তেহরান এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে। ২৭ ফেব্রুয়ারি কোনো প্রকার সমঝোতা চুক্তি ছাড়াই শেষ হয় সেই সংলাপ।পরের দিন ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একই সময়ে ইরানে সামরিক অভিযান ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’ শুরু করে ইসরায়েলও।যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এ যৌথ হামলার প্রথম ধাক্কাতেই প্রাণ হারান ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তার পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য। ৩৩ দিন ধরে চলমান এই যুদ্ধে এরই মধ্যে প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলী লারিজানি, সামরিক বাহিনীর অভিজাত শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর শীর্ষ কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপৌরসহ বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে হারিয়েছে ইরান। দেশটির বিভিন্ন সামরিক-বেসামরিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও ধ্বংস কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া, ইরানের ২ হাজারের বেশি মানুষ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন এখন পর্যন্ত।তবে, পাল্টা জবাব দিচ্ছে ইরানও। যুদ্ধের শুরু থেকেই ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলের ৬ দেশ সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্তর আরব আমিরাত, ওমানে অবস্থিত মার্কিন সেনাঘাঁটি ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে দফায় দফায় ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা শুরু করে ইরান, যা এখনও চলছে। ইরানের লাগাতার হামলার মুখে প্রায় ভেঙে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।এ অবস্থায় লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুতির বাহিনীর এই যুদ্ধে যোগদান অনেকটাই শক্তি বাড়িয়ে দিয়েছে ইরানের। এছাড়া, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় এখন আরও কার্যকরভাবে শত্রুপক্ষের ওপর আঘাত হানতে সক্ষম হচ্ছে তারা।
২ এপ্রিল ২০২৬ রাত ০৯:৩৭:৩৩