• ঢাকা
  • |
  • শুক্রবার ২৮শে আষাঢ় ১৪৩১ রাত ০৯:৪১:১৫ (12-Jul-2024)
  • - ৩৩° সে:
এশিয়ান রেডিও
  • ঢাকা
  • |
  • শুক্রবার ২৮শে আষাঢ় ১৪৩১ রাত ০৯:৪১:১৫ (12-Jul-2024)
  • - ৩৩° সে:

রোজ গার্ডেন থেকে স্মার্ট বাংলাদেশ

রোমান কবির: সবেমাত্র দেশভাগ হয়েছে। মুসলিম লীগের নেতৃত্বে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে। কিন্তু যতো গেছে দিন, ততো বেড়েছে বৈষম্য। পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে বিভাজনরেখা স্পষ্ট হতেই মুসলিম লীগের পূর্ব পাকিস্তানের উদারপন্থী ও অসাম্প্রদায়িক নেতারা একজোট হন। সম্মিলিতভাবে মুসলিম লীগের গোঁড়ামি আর কট্টরনীতির বিরোধিতা করে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে দলের উদারপন্থী নেতারা নতুন রাজনৈতিক দল গঠনে সিদ্ধান্ত নেন। আর এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে একটি সভা ডাকা হয়।  পাকিস্তানের স্বাধীনতার মাত্র দুই বছর পেরিয়েছে। সেদিন ছিলো ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন। এদিন বিকেলে পুরান ঢাকার কে এম দাস লেনে অবস্থিত কাজী হুমায়ুন রশীদের মালিকানাধীন রোজ গার্ডেনে প্রায় আড়াইশ’র উপরে নেতাকর্মীর উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত সভায় গঠন করা হয় 'পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ'। যার সভাপতি হন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। পুরো পাকিস্তানের অর্থাৎ 'নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ'র সভাপতি হন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। সাধারণ সম্পাদক করা হয় শামসুল হককে। সে সময়ের তরুণ ছাত্রলীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান তখন কারাগারে আটক। কারাগারে থাকা অবস্থায় তিনি নির্বাচিত হন দলের যুগ্ম-সম্পাদক হিসেবে।  অসাম্প্রদায়িকতা ও অসাম্যের কথা বলে ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ ১৯৫৪ সালে ‘যুক্তফ্রন্ট’র সঙ্গে নির্বাচন করে সরকারে অংশ নেয়। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ নাম ধারণ করলে অনেকেই দল থেকে ছুটে যান। তবে দল, মত, ধর্মের বিভাজিত মানুষও যুক্ত হন আওয়ামী লীগের সঙ্গে। পরবর্তীতে অসাম্প্রদায়িক দল আওয়ামী লীগের হাল ধরেছিলেন তরুণ নেতা শেখ মুজিবর রহমান। ১৯৬৬ সালে যিনি পাকিস্তান সরকারের কাছে ৬ দফা দাবি তুলে ধরেছিলেন। যেই ৬ দফা স্বাধীনতার দলিল। বাঙালি জাতির মুক্তির একমাত্র সনদ হিসেবে বিবেচিত।রোজ গার্ডেনের সেই সভায় অসাম্প্রদায়িক চেতনায় তৈরি হওয়া ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ থেকে শেখ মুজিবের হাতে তৈরি ‘আওয়ামী লীগ’ ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়। সত্তরের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকার গঠন করে। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ।স্বাধীনতাপূর্ব সময়ে আওয়ামী লীগ পার করে ২১ বছর। এ সময়ে প্রতিষ্ঠাকালীন অনেকেই দল ছেড়ে দেন। কেউ রাজনীতিও ছেড়ে দেন। কিন্তু বাঙালির মুক্তির দূত হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব দেশের হাজারও তরুণ নেতৃত্বকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যান। মাসের পর মাস আন্দোলন, সংগ্রাম করেন, জেল খাটেন। তাঁর নেতৃত্বে তাঁর বলিষ্ঠ হুংকারে স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয় সারা দেশে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ছিষট্টির ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও একাত্তরের  মুক্তিযুদ্ধ এর সবই আওয়ামী লীগের হাত ধরেই এসেছে। পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী, হানাদার বাহিনী ও এদেশের কতিপয় পাকিস্তানপ্রেমী ব্যাক্তিত্বদের ষড়যন্ত্র, কুপরামর্শ, মামলা-হামলা সবকিছুই ছিলো আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে। কিন্তু আওয়ামী লীগের প্রথম অধ্যায়ে এর সফলতা অবাক করার মতো।আওয়ামী লীগের জন্মই হয়েছে স্বাধীনতার আকাঙ্খা নিয়ে আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। সরকারে থেকেও তারা আন্দোলন সংগ্রামের ধারক বাহক ছিল। এখনও আছে। জনতা ও জনগণের দল বলতে যদি কিছু বুঝায় তা শুধু খাটে আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেই। দলটির সৃষ্টির প্রারম্ভ থেকেই এর প্রমাণ মিলেছে। স্বাধীনতা পূর্ব সময়ে বাঙালির স্বাধীনতার জন্য যারাই সচেষ্ট থেকেছেন তাদেরই ধারস্থ হতে হয়েছে আওয়ামী লীগের। তৎকালীন সময়ের বাংলার বাঘ শেরে বাংলা একে ফজলুল হক কৃষক শ্রমিক জনতা পার্টি করেছিলেন। কিন্তু তিনিও আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই দলটির সঙ্গে থেকেছেন।পাকিস্তান সামরিক সরকারের সেই কঠোর শাসনের সময়েও আন্দোলন, সংগ্রাম, গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে নির্বাচনের পথ-ই বেছে নিয়েছে দলটি। সত্তরের নির্বাচনে জনগণের বিশাল ম্যান্ডেট নিয়ে জয়ী হয়েছে। আর তাতেই সম্ভব হয়েছে একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধ সংঘঠিত করার মতো কঠিন কাজ। যদিও নিজেদের নানা ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থের কারণেই স্বাধীনতাউত্তর দেশে দলটির সাথে থাকা অনেক রথী ও মহারথী দল ত্যাগ করেছে। কিন্তু কিছু ত্যাগী নেতা ও কর্মী দলে থেকে দলকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। অনেক স্বার্থবাদী কিন্তু জড়োও হয়েছে এ দলে। তবে আদর্শ ও ত্যাগের মহিমায় কিছু কর্মী দলকে বাঁচিয়েছে সযত্নে।স্বাধীনতার পর পুরোদমে আওয়ামী লীগ নিজেদের গোছানোর, দেশকে গোছানোর দায়িত্ব পেয়েছিলো। কিন্তু তাদের-ই একটা অংশের নতুন দল গঠনসহ বিরোধিতা, এমনকি বিরোধীদের সীমাহীন বিরোধিতার পাশাপাশি গোপন শত্রুদের দলে বিচরণ আটকাতে পারেনি তাদের। পঁচাত্তরে দক্ষিণ এশিয়া থেকে বিশ্ব রাজনীতির দৃঢ়চেতা ব্যক্তিত্ব মহান মানুষ, বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ ও জাতির পিতার পরিবারকে ধ্বংস করে দেওয়ার যে মাস্টরপ্লান সেটি কিঞ্চিত বাস্তবায়িত হয়েছে মনে হলেও মৃত্যুঞ্জয়ী আওয়ামী লীগ ও মৃত্যুঞ্জয়ী বঙ্গবন্ধুর পরিবার বাঙালিদের আশ্রয় হয়ে আবারও ফিরে এসেছে।যখন বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের নাম পুরোপুরি মুছে ফেলার শেষ পেরেক মারার জন্য প্রস্তুত বিরোধী শক্তি। সে সময় আওয়ামী লীগের ত্যাগী ও মৃত্যুঞ্জয়ী কর্মীদের দৃঢতায়, বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয় ৮১ সালে। তিনি হন আওয়ামী লীগের সভাপতি। তার সাথে থেকে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দিয়েছেন তার বোন শেখ রেহানা।শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার হাতে আওয়ামী লীগের পতাকা, আর তার ছায়াতলে হাজার হাজার নেতাকর্মী। অত্যন্ত সুশৃঙ্খল দল, গণতান্ত্রিক দল, যুদ্ধ-বিগ্রহ, নির্বাচন, সামরিক শাসনের যাতাকল, হত্যা, নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্রের ডামাডোলের মধ্যেও আওয়ামী লীগ ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠেছে। নিয়মিত কাউন্সিলের মাধ্যমে কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে দল গুছিয়েছে।স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটি গোছাতে বঙ্গবন্ধু সময় পেয়েছিলেন মাত্র সাড়ে তিন বছর। এরপর ঘটে ইতিহাসের সবচেয়ে নিকৃষ্টতম ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড। বাঙালি জাতির পিতাকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া, জাতির পিতার পরিবার ও দলকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার ঘৃণ্য চক্রান্ত। বিশেষ করে বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতা এনে দেওয়া আওয়ামী লীগকে শেষ করে পাকিস্তানি ধারায় দেশকে ফেরানোই যখন লক্ষ্য। ফিনিক্স পাখির মতো আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার দায়িত্ব গ্রহণ। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার সংগ্রাম আর বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচারের আওতায় এনে বাঙালিকে কলঙ্ক থেকে মুক্তি দেওয়ার সংগ্রাম। ২১ বছর পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ সরকার।পুনর্জীবিত আওয়ামী লীগ, পুনর্জীবিত বাঙালি, উন্নয়ন ও গণতন্ত্র, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন সোনার বাংলা, বৈষম্যহীন বাংলা। সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষ বাংলা। এর মাঝেও ২১ আগস্টে শেখ হাসিনাকেসহ পুরো আওয়ামী লীগকে শেষ করে দিতে সিরিজ বোমা হামলা করা হয়। মাইনাস ২ ফর্মুলার মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে মাইনাস করে দ্বিধা-ত্রিধা বিভক্ত আওয়ামী লীগে পরিণত করার ষড়যন্ত্র করা হয়।টানা চতুর্থ মেয়াদে ১৬ বছর বাঙালিরা ক্ষমতায় রেখেছে আওয়ামী লীগকে। ভাষানী-সোহরাওয়ার্দী থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগ এখন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার হাতে। ষড়যন্ত্র এখনও আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রেখেছে আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করতে। সুযোগ পেলেই মারবে ছোবল। তাই সদা সতর্ক থাকা জরুরি আওয়ামী লীগের। আত্মতুষ্টিতে না ভুগে আত্মসমালোচনা করা জরুরি আওয়ামী লীগের। শত্রু-মিত্র চেনা জরুরি আওয়ামী লীগের।    রোজ গার্ডেন থেকে বাঙালির মুক্তি সংগ্রামে যাত্রা করেছিলো আওয়ামী লীগ। সেই যাত্রা বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের অত্যাধুনিক ভবনে সদা ভাস্বর। ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণের ঘোষণা দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার এখন ক্ষমতায়। ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন স্বপ্ন নয়, দৃশ্যমান বাস্তব। আওয়ামী লীগ সরকারের এখন লক্ষ্য স্মার্ট বাংলাদেশ। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথে দেশ।লেখক: সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা