‘জেন জি’র পথ ধরে ভারতে শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে ‘জেন আলফা’র উত্থান
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ক্লাস শুরুর সময় পেরিয়ে গেলেও ভারতের উত্তর প্রদেশের সমুহী ভাতপুরওয়া গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১২২ শিক্ষার্থীর কেউই শ্রেণিকক্ষে ঢোকেনি। নতুন ভবন নির্মাণের নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত ক্লাসে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তারা। লাল-সাদা চেক ইউনিফর্ম পরা এসব শিক্ষার্থীর অনেকের বয়স মাত্র ছয় বছর। আট বছরের প্রিয়া (ছদ্মনাম)সহ কয়েকজনের হাতে ছিল ভারতের জাতীয় পতাকা।স্কুলটির বর্তমান ভবনটি পুরোনো ও জরাজীর্ণ। ২০২৩ সালে দেয়াল ধসে এক ছাত্রী গুরুতর আহত হওয়ার পর ভবনের একটি অংশ এখনো ধ্বংসস্তূপ হয়ে পড়ে আছে। নিরাপত্তার স্বার্থে শিশুরা তখন থেকেই নতুন ভবনের দাবি জানিয়ে আসছিল। কিন্তু গত ২২ আগস্ট তারা প্রতিবাদে নামার পর বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আসে।শিক্ষার্থীদের ধর্মঘটের খবর ছড়িয়ে পড়লে শিক্ষা বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা স্কুল পরিদর্শনে আসেন। ব্লক শিক্ষা কর্মকর্তা দীপক অবস্তি দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণের আশ্বাস দিলে সন্ধ্যার দিকে শিক্ষার্থীরা বাড়ি ফিরে যায়।প্রিয়া বলে, ‘আমি খুশি। আমরা নতুন একটি ভবন পাব। আমরা আতঙ্কে থাকতাম, যে যেকোনো দিন স্কুলের এই ভবনটি ভেঙে পড়তে পারে। এর অবস্থা খুবই খারাপ। ভয়ের কারণে আমরা পড়ালেখায় মনোযোগ দিতে পারি না। সেজন্যই আমরা সবাই প্রতিবাদ করেছি।’প্রিয়া ও তার বন্ধুরা একা নয়। জুলাইয়ের শেষদিক থেকে মহারাষ্ট্র, বিহার, রাজস্থান, ঝাড়খণ্ড ও মধ্যপ্রদেশসহ ভারতের অন্তত ১০টি রাজ্যের শিক্ষার্থীরা একই ধরনের আন্দোলনে নেমেছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় সরকারি স্কুলগুলোর জরাজীর্ণ অবস্থা, শিক্ষক সংকট ও মৌলিক সুবিধার অভাবের বিরুদ্ধে এসব প্রতিবাদ বেশি দেখা গেছে।এই আন্দোলন ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য যেমন বড় চ্যালেঞ্জ, তেমনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের জন্যও নতুন রাজনৈতিক পরীক্ষা। তরুণদের সমর্থন ধরে রাখতে সরকারকে এমনিতেই নানা চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে।জেন জি থেকে জেন আলফাজুনের শুরুতে হাজার হাজার ‘জেন জি’ বিক্ষোভকারী ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে জড়ো হন। ধারাবাহিক প্রশ্নপত্র ফাঁস ও এর জেরে তরুণদের মধ্যে তৈরি হওয়া ক্ষোভের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করাই ছিল তাদের অন্যতম প্রধান দাবি।বিক্ষোভকারীদের ক্ষোভ নিরসনের বদলে সরকার তাদের বিদেশি শক্তির অনুগৃহীত চরমপন্থি হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করলে আন্দোলন আরও জোরালো হয়। পরে বেকারত্ব ও শিক্ষা ব্যবস্থার পদ্ধতিগত ত্রুটি আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে ওঠে।জুলাইয়ে শিক্ষা ও বেকারত্ব নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশে গঠিত ব্যঙ্গাত্মক সংগঠন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) এই যুব আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়। পার্লামেন্ট অভিমুখে শান্তিপূর্ণ পদযাত্রায় নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নের পর আন্দোলনটি আরও ব্যাপক জনসমর্থন পায়। একপর্যায়ে বিজেপির নেতা ও শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন।এরপর সিজেপি ভারতের স্কুলগুলোর অবস্থার দিকে নজর দেয়। সমুহী ভাতপুরওয়ার মতো স্কুলের শিক্ষার্থীরা এখন শিক্ষক ও কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহি চাইছে। জেন জি আন্দোলনের পরপরই শুরু হওয়া এই নতুন প্রজন্মের আন্দোলনকারীদের অনেকেই ‘জেন আলফা’ আন্দোলনের সূচনাকারী হিসেবে দেখছেন।ভারতের স্কুলগুলোর মূল সমস্যা কোথায়ভারতে প্রায় ১৫ লাখ স্কুলে ২৪ কোটি ৭০ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। এর প্রায় ৭০ শতাংশ স্কুল কেন্দ্র, রাজ্য বা স্থানীয় সরকারের অধীনে পরিচালিত হয়। ২০২৫-২৬ সালে প্রকাশিত সরকারি স্কুল নিরীক্ষা প্রতিবেদনে শিক্ষা ব্যবস্থায় অগ্রগতির কথা বলা হয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতও উন্নত হয়ে প্রতি ২৪ শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক হয়েছে এবং ঝরে পড়ার হার কমেছে।তবে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বাস্তব অভিজ্ঞতা অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন। কোনো কোনো স্কুলে এমন ভবনেও পাঠদান হয়, যেখানে গবাদিপশু পালন করা হয়।বেঙ্গালুরুভিত্তিক শিক্ষা অধিকার কর্মী নাগাসিমহা রাও বলেন, ‘শিশুরা তাদের অধিকার দাবি করছে। তারা শিক্ষক, বেঞ্চ, স্কুল ভবন, খাবার পানি, বিদ্যুৎ এবং টয়লেট চায়। দুর্ভাগ্যবশত, দীর্ঘদিন ধরে স্কুল পরিচালনার জন্য মৌলিক অবকাঠামো ও প্রয়োজনীয় জনবলের ঘাটতি রয়েছে। এটি দেশের অধিকাংশ সরকারি স্কুলেরই গল্প।’সরকারি স্কুলগুলোতে মূলত আর্থিক ও সামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের শিশুরা পড়াশোনা করে উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন করেন, ‘দরিদ্র শিশুরা এসব স্কুলে পড়ে বলেই কি এই অবহেলা?’বর্তমান আন্দোলনের শুরুর দিকের একটি ঘটনা ঘটে ২৮ জুলাই উত্তর প্রদেশের সারভোদয় ইন্টার কলেজে। দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত থাকা এই স্কুলের শিক্ষার্থীরা খাবার পানি, বিদ্যুৎ ও বসার বেঞ্চের দাবিতে আন্দোলনে নামে।দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মনোজ (ছদ্মনাম) বলে, ‘স্কুলে পড়ালেখা করা আমাদের জন্য কতটা কঠিন, তা কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। এখানে বিদ্যুৎ নেই, ফলে তাপদাহের মধ্যে ফ্যান চলে না। সুপেয় পানির ব্যবস্থাও নেই। পর্যাপ্ত বেঞ্চ না থাকায় অনেক শিক্ষার্থীকে মেঝেতে বসতে হয়। তাই আমরা প্রতিবাদ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’মনোজের সহপাঠী নীলম (ছদ্মনাম) জানায়, শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরেই এসব মৌলিক সুবিধার দাবি জানিয়ে আসছিল। এবার তারা প্ল্যাকার্ড ও স্লোগান নিয়ে আনুষ্ঠানিক আন্দোলনের সিদ্ধান্ত নেয়।৩১ জুলাই মহারাষ্ট্রের পারলিতে ১৯৪১ সালে প্রতিষ্ঠিত বৈজনাথ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও শিক্ষক সংকটের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করে।‘জেন আলফা’র পাশে ‘জেন জি’১৫ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবসে সিজেপি তাদের তৃণমূল উদ্যোগ ‘স্কুল ঠিক করো’ চালু করে। সংগঠনটির আইনবিষয়ক প্রধান রত্না সিং আল জাজিরাকে জানান, শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নের দাবিতে সারা দেশের স্কুলগুলোতে শুরু হওয়া আন্দোলনকে তারা সমর্থন করছেন।তিনি বলেন, যন্তর মন্তরের বিক্ষোভে তারা গ্রামীণ এলাকা থেকে আসা অনেক শিশু ও অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা স্কুলের জরাজীর্ণ অবস্থা, শিক্ষক সংকট এবং স্কুলে যাওয়ার ভাঙাচোরা রাস্তার কথা জানিয়েছেন। শিশুদের ভবিষ্যতের জন্য স্কুল সংস্কারের দাবি তাই তাদের আন্দোলনেরই ধারাবাহিকতা।তবে বিভিন্ন অঞ্চলের স্কুল পরিদর্শন ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে সিজেপি সদস্যরা কয়েকটি সহিংস ঘটনার মুখে পড়েন। উত্তর প্রদেশের সংগঠনটির সদস্য গৌরব ভারতী অভিযোগ করেন, পুলিশ ও স্থানীয় কিছু ব্যক্তি তাদের হুমকি দিচ্ছেন।তিনি বলেন, ১৬ আগস্ট কানপুর মাজরার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করে এর করুণ অবস্থা তুলে ধরার পর থেকেই পুলিশ তাকে অনুসরণ করছে। তবে তারা ভয় পাচ্ছেন না; আইনের আওতায় থেকেই শিক্ষার্থীদের অধিকার দাবি করছেন।২০০৯ সালে কার্যকর হওয়া শিক্ষার অধিকার আইন অনুযায়ী, ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের শিক্ষা মৌলিক অধিকার। আইনে সব ধরনের আবহাওয়ার উপযোগী ভবন, পানি, স্যানিটেশন ও শিশুদের নিরাপত্তার মতো বিষয়কে আদর্শ অবকাঠামোর অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত অন্তত ১:৩০ থাকার কথাও বলা হয়েছে।জাতীয় গড়ের হিসাবে এ অনুপাত বজায় থাকলেও সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভারতে ১ লাখ ৮৪৩টি স্কুলে সব শ্রেণি মিলিয়ে মাত্র একজন শিক্ষক রয়েছেন। এসব স্কুলে প্রায় ২৯ লাখ শিশু পড়াশোনা করে। অন্যদিকে, ৫ হাজার ৬৬৩টি ‘ভূতুড়ে স্কুল’ রয়েছে, যেখানে কোনো শিক্ষার্থীই ভর্তি নেই।দেশটির বিশাল টিফিন কর্মসূচিতে নিম্নমানের খাবার পরিবেশনও প্রায়ই প্রতিবাদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ২৮ জুলাই বিহারের সিমুয়ারা গ্রামের প্রায় ৫০ শিক্ষার্থী নিম্নমানের খাবারের অভিযোগ নিয়ে এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করতে চার কিলোমিটার হেঁটে যায়। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, স্কুলে পাইপলাইনের পানি না থাকায় রান্নার আগে কাঁচামাল ঠিকমতো ধোয়া হয় না এবং চাল, ডাল ও সবজির মানও অত্যন্ত খারাপ।চেন্নাইভিত্তিক শিক্ষাবিদ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্বর্ণা রাজাগোপালনের মতে, ভারতের স্কুল ব্যবস্থায় পদ্ধতিগত সংস্কার প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে সর্বত্র মানসম্মত অবকাঠামো নিশ্চিত করা, শিক্ষক নিয়োগ ও দক্ষতা বৃদ্ধি, পরিবারগুলোকে সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে উৎসাহিত করা এবং আইন না মানলে জবাবদিহি নিশ্চিত করা।স্কুলের এসব আন্দোলন ক্ষমতাসীন সরকারের জন্য ভবিষ্যতের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জেরও ইঙ্গিত দিচ্ছে। ভারতের ৩০ শতাংশের বেশি মানুষের বয়স ১৮ বছরের নিচে। আজ যারা স্কুলে প্রতিবাদ করছে, তাদের অনেকেই ২০২৯ সালের পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে ভোটার হবে।পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাকর্মী আকাশ সরকার বলেন, ‘শিশুরাই আমাদের ভবিষ্যৎ। তারা যদি উপযুক্ত পরিবেশে সঠিক শিক্ষা না পায়, তবে তা ভারতের প্রবৃদ্ধিকে ব্যাহত করবে। এই শিশুরাই আগামী দিনের ভোটার।’বেঙ্গালুরুর ব্যাঙ্গালোর ইউনিভার্সিটির ছাত্রী সুজাতা গৌড়ার কাছেও জেন জি ও জেন আলফার ধারাবাহিক প্রতিবাদ আশ্চর্যের নয়। ২১ বছর বয়সী এই ছাত্রী বলেন, দেশজুড়ে শিক্ষার্থীরা মনে করছে তারা ব্যবস্থার কাছে উপেক্ষিত। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিকায়ন, যোগ্য শিক্ষক, সুষ্ঠু পরীক্ষা এবং উন্নত অবকাঠামোর পাশাপাশি কর্তৃপক্ষকে শিক্ষার্থীদের কথাও শুনতে হবে। তা না হলে সারা দেশে আরও আন্দোলন ছড়িয়ে পড়তে পারে।সূত্র: আল জাজিরা