• ঢাকা
  • |
  • সোমবার ১৮ই ফাল্গুন ১৪৩২ দুপুর ০২:৩১:৩০ (02-Mar-2026)
  • - ৩৩° সে:
যেভাবে ইরানের ক্ষমতার চূড়ায় খামেনি

যেভাবে ইরানের ক্ষমতার চূড়ায় খামেনি

সৈয়দ আতিক: মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একজন ছিলেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ১৯৩৯ সালে মাশহাদ শহরে জন্ম নেওয়া এই ধর্মীয় নেতা ১৯৮৯ সাল থেকে ইরানের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। দেশটির সামরিক, বিচারিক ও কৌশলগত নীতিনির্ধারণে চূড়ান্ত কর্তৃত্ব ছিল তাঁর হাতে। অবশেষে ২৮ ফেব্রুয়ারি শনিবার তেহরানে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার পর ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি মারা যান।শৈশব ও ধর্মীয় শিক্ষাজীবন: একটি ধর্মপ্রাণ পরিবারে জন্ম নেওয়া খামেনি অল্প বয়সেই কোরআন ও ইসলামি ফিকহ শিক্ষায় মনোনিবেশ করেন। পরবর্তীতে তিনি ইরানের ধর্মীয় শিক্ষার কেন্দ্র কোমে উচ্চতর ধর্মতত্ত্ব অধ্যয়ন করেন। এখানেই তিনি ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হন ইরানের বিপ্লবী নেতা রুহুল্লাহ খোমেনির মতাদর্শের সঙ্গে, যা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।শাহবিরোধী আন্দোলন ও কারাবরণ: ১৯৬০-৭০ দশকে ইরানের শাহ সরকারের বিরুদ্ধে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন খামেনি। একাধিকবার গ্রেফতার ও নির্যাতনের শিকার হন। তাঁর বক্তৃতা ও লেখালেখি তৎকালীন তরুণ সমাজের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল।১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব: ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে শাহ শাসনের পতন ঘটে এবং খোমেনি দেশের সর্বোচ্চ নেতা হন। নতুন ইসলামি প্রজাতন্ত্রে খামেনি দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অবস্থানে উঠে আসেন।রাষ্ট্রপতি পদে আরোহণ: ১৯৮১ সালে তিনি ইরানের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। এই সময় চলছিল ইরান-ইরাক যুদ্ধ। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক নীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। একই বছর এক বোমা হামলায় গুরুতর আহত হন; সেই হামলার পর তাঁর ডান হাত আংশিকভাবে অকার্যকর হয়ে যায়।সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দীর্ঘ অধ্যায়: ১৯৮৯ সালে খোমেনির মৃত্যুর পর বিশেষজ্ঞ পরিষদের সিদ্ধান্তে খামেনি ইরানের সুপ্রিম লিডার নির্বাচিত হন। এই পদ ইরানের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর অবস্থান। ইরানের সর্বোচ্চ ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি শুধু একজন ধর্মীয় নেতা নন, তিনি ছিলেন ইরানের রাষ্ট্রকাঠামো, সামরিক নীতি ও আঞ্চলিক কৌশলের প্রধান নিয়ন্ত্রক। তাঁর নেতৃত্বে ইরান একটি আদর্শভিত্তিক বিপ্লবী রাষ্ট্র থেকে ধীরে ধীরে আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।রাজনৈতিক কাঠামোয় তাঁর প্রভাব: ইরানের সংবিধান অনুযায়ী সুপ্রিম লিডার হলেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ। আর খামেনির নিয়ন্ত্রণাধীন ক্ষেত্রগুলো হলো: সশস্ত্র বাহিনী ও রেভল্যুশনারি গার্ড, বিচার বিভাগীয় প্রধান নিয়োগ, রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম, গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ও পররাষ্ট্রনীতি অনুমোদন। রাষ্ট্রপতি ও সংসদ নির্বাচিত হলেও চূড়ান্ত নীতিগত প্রশ্নে সুপ্রিম লিডারের কথাই শেষ কথা। ফলে ইরানের রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব ছিল সরাসরি ও দীর্ঘমেয়াদি।গত তিন দশকে তিনি ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারে ভূমিকা রেখেছেন—বিশেষ করে ইরাক, সিরিয়া ও লেবাননে ইরানের উপস্থিতি জোরদারে সমর্থন দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি ও সংসদ নির্বাচিত হলেও চূড়ান্ত নীতিগত প্রশ্নে সুপ্রিম লিডার হিসেবে তাঁর কথাই ছিল শেষ কথা।পারমাণবিক ইস্যু: খামেনির আমলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় বিতর্কের জন্ম দেয়। পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও আঞ্চলিক উত্তেজনা তাঁর নেতৃত্বকালেই তীব্র হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তাঁর কঠোর অবস্থান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ইরানকে একটি বিশেষ ভূমিকায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।ছাত্রজীবন থেকে সর্বোচ্চ নেতা: রাষ্ট্রপতি পদ এবং সর্বোচ্চ নেতা—আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাজনৈতিক জীবন ইরানের আধুনিক ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রায় ৩৭ বছর ধরে তিনি দেশটির নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করেছেন এবং তাঁর নেতৃত্বই ইরানের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।লেখক: ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, সিটি নিউজ।