আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ১৫ বছরের বেশি সময় পর সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ জাতীয় নির্বাচনের মুখোমুখি হচ্ছে বাংলাদেশ। ভোটের মাঠে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এগিয়ে রয়েছে বলে ধারণা করা হলেও, ইসলামপন্থি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন একটি জোট এবার তাদের ইতিহাসের সেরা নির্বাচনী ফল করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি ও দেশত্যাগের পর উদ্ভূত রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এই নির্বাচন, যা দেশের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা, অর্থনীতি ও আঞ্চলিক কূটনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।

বার্তাসংস্থা রয়টার্স বলছে, দীর্ঘ দেড় দশকের একচেটিয়া রাজনৈতিক আধিপত্যের পর বাংলাদেশ এখন এক নতুন রাজনৈতিক মোড়ে দাঁড়িয়ে। শেখ হাসিনার শাসনামলে বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক তৎপরতা ছিল সীমিত। কখনও নির্বাচন বর্জন, কখনও শীর্ষ নেতাদের গণগ্রেপ্তারের কারণে তারা কার্যত রাজপথের বাইরে ছিল। তবে ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে।


২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ এখন নিষিদ্ধ। আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নেওয়া অনেক তরুণ বলছেন, ২০০৯ সালের পর এটিই হতে যাচ্ছে দেশের প্রথম প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন—যে বছর শেখ হাসিনা টানা ১৫ বছরের শাসন শুরু করেছিলেন।
রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হবে বলে ‘ব্যাপকভাবে ধারণা’ করা হচ্ছে। তবে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট তাদের জন্য শক্ত চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। এ ছাড়া ৩০ বছরের কম বয়সী জেনারেশন জেড কর্মীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি নতুন দল জামায়াতের সঙ্গে জোট বেঁধেছে। যদিও তারা হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখলেও, সেই জনসমর্থনকে এখনো স্বতন্ত্র বড় নির্বাচনী শক্তিতে রূপ দিতে পারেনি।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান রয়টার্সকে বলেন, তার দল সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯২টিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে এবং সরকার গঠনের মতো পর্যাপ্ত আসন পাবে বলে তিনি আত্মবিশ্বাসী।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে স্পষ্ট রায় আসে, তবে ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরতে সহায়ক হবে। শেখ হাসিনার পতনের পর কয়েক মাসের অস্থিরতায় তৈরি পোশাক খাতসহ প্রধান শিল্প খাতগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশের জন্য বড় ধাক্কা।
এই নির্বাচনের ফলাফল দক্ষিণ এশিয়ায় চীন ও ভারতের ভূমিকাকেও নতুনভাবে প্রভাবিত করতে পারে। ঢাকাভিত্তিক সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসি বলেন, ‘জনমত জরিপে বিএনপি এগিয়ে থাকলেও ভোটারদের একটি বড় অংশ এখনো সিদ্ধান্তহীন। বিশেষ করে জেনারেশন জেডের ভোট গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মোট ভোটারের প্রায় এক-চতুর্থাংশই এই প্রজন্মের।’
নির্বাচনী প্রচারণায় সারা দেশে বিএনপির ‘ধানের শীষ’ ও জামায়াতের ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকের পোস্টার-ব্যানারে ভরে উঠেছে খুঁটি, গাছ ও সড়কের দেয়াল। বিভিন্ন মোড়ে দলীয় প্রতীকসংবলিত অস্থায়ী কার্যালয় থেকে ভেসে আসছে প্রচারণার গান। আগের নির্বাচনের তুলনায় এটিই বড় পরিবর্তন, তখন সর্বত্রই আওয়ামী লীগের ‘নৌকা’ প্রতীকের আধিপত্য দেখা যেত।
জনমত জরিপে ধারণা করা হচ্ছে, একসময় নিষিদ্ধ থাকা জামায়াতে ইসলামীর প্রতি ভোটারদের সমর্থন এবার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। তবে দলটি এককভাবে সরকার গঠন করতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। দলটি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, এই ইতিহাসও আলোচনায় রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের ফল ভারতের ও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের দিকনির্দেশনাও দেবে। শেখ হাসিনাকে ভারতের ঘনিষ্ঠ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি নয়াদিল্লিতে আশ্রয় নেন। এর পর থেকেই বাংলাদেশে চীনের প্রভাব বাড়ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
কিছু বিশ্লেষকের মতে, বিএনপি তুলনামূলকভাবে দিল্লির সঙ্গে সমন্বয়মূলক অবস্থান নিতে পারে। অন্যদিকে, জামায়াত নেতৃত্বাধীন সরকার গঠিত হলে বাংলাদেশ পাকিস্তানের দিকে বেশি ঝুঁকতে পারে বলে তাদের ধারণা। জামায়াতের জেন-জেড মিত্র দলটি ‘নয়াদিল্লির আধিপত্য’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং সম্প্রতি চীনা কূটনীতিকদের সঙ্গেও বৈঠক করেছে। তবে জামায়াত দাবি করেছে, তারা কোনো দেশের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট নয়।
বিএনপির তারেক রহমান বলেন, সরকার গঠন করলে যে দেশ বাংলাদেশের জনগণ ও রাষ্ট্রের জন্য উপযোগী প্রস্তাব দেবে, তাদের সঙ্গেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা হবে।
অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ এখনো চ্যালেঞ্জের মুখে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া এবং বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়ায় ২০২২ সাল থেকে দেশটি আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছ থেকে বিলিয়ন ডলার সহায়তা নিতে বাধ্য হয়েছে।
ঢাকাভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন এবং বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক ওপিনিয়ন স্টাডিজের জরিপ অনুযায়ী, ১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ দুর্নীতি, এরপরেই রয়েছে মূল্যস্ফীতি।
বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের প্রতি ভোটারদের আকর্ষণের প্রধান কারণ তাদের ‘পরিষ্কার ভাবমূর্তি’; ধর্মীয় অবস্থান নয়। জরিপে আরও বলা হয়েছে, ভোটাররা ধর্মীয় বা প্রতীকি ইস্যুর চেয়ে দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক সংকটকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন এবং দায়িত্বশীল, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব প্রত্যাশা করছেন।
সব মিলিয়ে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমানকে পরবর্তী সরকারপ্রধান হওয়ার সবচেয়ে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট এগিয়ে গেলে তাদের চেয়ারম্যান ডা. শফিকুর রহমানও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে থাকতে পারেন।
২১ বছর বয়সী প্রথমবারের ভোটার মোহাম্মদ রাকিব বলেন, তিনি আশা করেন পরবর্তী সরকার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ভোটাধিকার নিশ্চিত করবে। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ শাসনে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিল। ভোট দেওয়ার বা কথা বলার সুযোগ ছিল না। যে দলই ক্ষমতায় আসুক, তারা যেন এই স্বাধীনতা নিশ্চিত করে—এটাই আমার প্রত্যাশা।’
(এই ওয়েবসাইটের যেকোনো কিছু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি)
© 2026, এশিয়ান অনলাইন টিভি  |  সর্বস্বত্ব সংরক্ষিতDeveloped by Future IT
Recent comments
Latest Comments section by users
No comment available