আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের নেওয়া একের পর এক পদক্ষেপ বিশ্বকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব থেকে দূরে সরে যাওয়ার দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ ই. স্টিগলিটজ।
প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে প্রকাশিত এক মতামতধর্মী নিবন্ধে তিনি বলেন, মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট যাকে ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ হিসেবে অভিহিত করেছেন, তার মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলোর ওপরও নিষেধাজ্ঞার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তবে এতে অন্য দেশগুলোকে ইরানবিরোধী অবস্থানে আনার বদলে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক প্রভাব আরও দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
স্টিগলিটজের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা ট্রাম্পের ইরানবিরোধী যুদ্ধে যুক্ত হতে অনাগ্রহী হওয়ার কারণ স্পষ্ট। যুদ্ধ শুরুর আগে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করা হয়নি। এর ওপর ইরানের সরকারকে উৎখাতের প্রচেষ্টা সফল না হওয়ায় এখন কোনো বিকল্প পরিকল্পনাও নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, যে প্রশাসন নিয়মিত মিত্র ও অংশীদারদের সমালোচনা করে, গ্রিনল্যান্ড ও কানাডার মতো ভূখণ্ড নিয়ে হুমকি দেয় এবং মিত্রদের ওপরও শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করে, তাদের পাশে দাঁড়াতে অন্য দেশগুলো কেন আগ্রহী হবে—এ প্রশ্নই সামনে আসছে।
ট্রাম্পের ওপর আস্থা কমছে
স্টিগলিটজের মতে, অন্য দেশগুলোকে সঙ্গে নিতে হলে হয় তাদের বোঝাতে হবে, নয়তো ভয় দেখাতে হবে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের ক্ষেত্রে কোনো পথই কার্যকর হচ্ছে না। এর অন্যতম কারণ হিসেবে তিনি ট্রাম্পের বক্তব্যের বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন।
তিনি উল্লেখ করেন, ২০২৫ সালের জুনে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করা হয়েছে। পরে মার্চে ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংসের দাবিও করেন তিনি। অথচ যে যুদ্ধ চার সপ্তাহ বা তার কিছু বেশি সময় চলার কথা বলা হয়েছিল, তা সপ্তম মাসে গড়িয়েছে বলে স্টিগলিটজ লিখেছেন।
তার ভাষায়, ইরান থেকে কানাডা—অনেক দেশই বুঝতে পারছে, ট্রাম্পের সঙ্গে কোনো চুক্তি হলেও সেটির স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে।
বদলে যাচ্ছে বৈশ্বিক অর্থনীতির ভারসাম্য
স্টিগলিটজ মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসন এখনো অতীতের মতো যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাবকে শক্তিশালী মনে করছে। কিন্তু বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বদলে গেছে।
তার হিসাব অনুযায়ী, ক্রয়ক্ষমতার সমতা অনুযায়ী বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদনে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের প্রায় ৩০ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে ১৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।
একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সরবরাহ ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের একক প্রভাবও কমেছে। উন্নত প্রযুক্তির চিপ উৎপাদনে তাইওয়ানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার পাশাপাশি চীন বিরল খনিজ ও চুম্বক উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
ইরানের তেল রপ্তানির ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের চাপ প্রয়োগের সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেছেন স্টিগলিটজ। তার মতে, ইরানের তেলের বড় অংশের ক্রেতা চীন হওয়ায় ওয়াশিংটনের চাপ সহজে কাঙ্ক্ষিত ফল নাও দিতে পারে।
‘পোস্ট-আমেরিকান’ বিশ্বব্যবস্থার আশঙ্কা
স্টিগলিটজের মতে, ট্রাম্পের আগ্রাসী নীতির কারণে বিভিন্ন দেশ বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বহুমুখী করার দিকে এগোচ্ছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
তিনি বলেন, চীনসহ অন্যান্য দেশ যদি ট্রাম্প প্রশাসনের সর্বশেষ দাবির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, তাহলে তারা সহজে ভেঙে পড়বে না। বরং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক চাপের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হতে পারে।
তার আশঙ্কা, বেসেন্টের ঘোষিত ‘অর্থনৈতিক বিশ্বযুদ্ধ’ শেষ পর্যন্ত অচলাবস্থায় পৌঁছাতে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্রকে বড় মূল্য দিতে হতে পারে এবং অন্য দেশগুলোর ওপর চাপ প্রয়োগের ফলে ওয়াশিংটনের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও ‘সফট পাওয়ার’ আরও দুর্বল হতে পারে।
স্টিগলিটজের মতে, একসময় যুক্তরাষ্ট্র গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক সুযোগ ও বিভিন্ন মূল্যবোধের কারণে বিশ্বের কাছে আদর্শ হিসেবে বিবেচিত হতো। কিন্তু বর্তমানে দেশটির চরম বৈষম্য, গণতান্ত্রিক অবক্ষয়, দুর্নীতি ও সামাজিক বিভাজন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে।
তিনি মনে করেন, সহযোগিতা ও আইনের শাসনের গুরুত্বকে নতুন করে গুরুত্ব দিয়ে বিশ্বকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের ওপর নির্ভরতা কমানোর বিষয়টি ভাবতে হবে। তার দৃষ্টিতে, অন্তত আপাতত যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব থেকে কিছুটা দূরে সরে যাওয়া একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থা আরও স্থিতিশীল, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ হতে পারে।
সূত্র : প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
(এই ওয়েবসাইটের যেকোনো কিছু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি)
© 2026, এশিয়ান অনলাইন টিভি  |  সর্বস্বত্ব সংরক্ষিতDeveloped by Future IT
Recent comments
Latest Comments section by users
No comment available