আন্তর্জাতিক ডেস্ক: “আমাদের কোনো ব্যক্তিগত জীবন নেই, নেই কোনো মানসিক শান্তি। প্রতিদিন সকালে পানির লাইনে দাঁড়িয়ে নিজের ও প্রতিবেশীদের দেখে হারিয়ে যাওয়া স্বাভাবিক জীবনের স্বপ্ন বুনি। আমরা এখন যেন নিজেদের কাছেই অচেনা এক একজন মানুষ।”—কথাগুলো গাজার বিশিষ্ট লেখক ও কবি আকরাম আল-সুরানির।
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বই ‘আ হোমল্যান্ড আউট অব কাভারেজ’, ‘হাফ-বেকড হোমল্যান্ড’ এবং ‘হোয়াটস দ্যাট’-এর এই রচয়িতা গাজায় তথাকথিত ‘যুদ্ধবিরতি’র এক বছর পূর্ণ হওয়ার পর নিজের চরম বাস্তবতার কথা তুলে ধরেছেন।
তিনি বলেন, “প্রতিদিন সকালে পানি নেওয়ার লাইনে দাঁড়িয়ে মনে পড়ে, একসময় আমাদের প্রত্যেকেরই তো একটি নিজস্ব জীবন ছিল। ছিল ব্যক্তিগত ঘরবাড়ি, শৌচাগার, এমনকি নিজের একটি টুথব্রাশ! কীভাবে পরিচ্ছন্ন পানি পান করতাম, স্বাচ্ছন্দ্যে মুখ ধুতাম—ভাবতেই পারি না যে এই সামান্য কাজগুলোই এখন একেকটি যুদ্ধে পরিণত হবে। গরম পানির ঝরনার নিচে গোসল করাটা আজ এক অলীক স্বপ্নে রূপ নিয়েছে।”
কাগজে-কলমে ‘যুদ্ধবিরতি’ ঘোষণার এক বছর পার হলেও গাজাবাসীর জীবন থেকে যুদ্ধ, বোমাবর্ষণ আর মৃত্যুর বিভীষিকা বিন্দুমাত্র সরেনি।
লেখক সুরানির মতে, যুদ্ধ মানে কেবল ভবন ধ্বংস করা বা মানুষকে ভিটেমাটি ছাড়া করা নয়। এই মূল যুদ্ধের ভেতরে প্রতিদিন লড়তে হয় আরও শত শত অদৃশ্য যুদ্ধ। তাঁবুতে টিকে থাকার যুদ্ধ, সার্বক্ষণিক মাথার ওপর নজরদারি ড্রোনের ‘জান্নানা’ শব্দের সঙ্গে লড়াইয়ের যুদ্ধ, এক শৌচাগারের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার যুদ্ধ এবং একটি ছোট ঘরে ৩০ জন মানুষ গাদাগাদি করে বসবাস করার যুদ্ধ। এভাবেই প্রতিনিয়ত মৃত্যু ঘটছে মানুষের ন্যূনতম ব্যক্তিগত গোপনীয়তার।
সন্তানদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “প্রতি সকালে একটাই প্রশ্ন তাড়া করে—আজ কী হবে? গুঁড়িয়ে যাওয়া স্কুলের অবশিষ্টাংশ থেকে আমার সন্তানেরা কি অক্ষত অবস্থায় ধ্বংসস্তূপের ঘরে ফিরতে পারবে? রাস্তা বলতে যা অবশিষ্ট আছে, তা দিয়ে হাঁটার সময় যেকোনো মুহূর্তে বোমা এসে তাদের কেড়ে নিতে পারে।”
জ্বালানি সংকট, বারবার সীমান্ত বন্ধ রাখা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তীব্র ঘাটতির কারণে গাজায় যাতায়াত ব্যবস্থা চরম সংকটজনক ও ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। ফলে সুরানির সন্তানদের প্রতিদিন দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে গন্তব্যে যেতে হয়।
তাঁর ভাষায়, “মনে হয় জীবনটাকেও আমাদের মাঝে ফোঁটা ফোঁটা রেশন হিসেবে মেপে দেওয়া হচ্ছে।”
গাজায় আজ সকালে জীবিত জেগে ওঠাটাই শেষ কথা নয়; যে রাতে যে ঘরে ঘুমানো হলো, পরদিন রাতে সেখানে আর থাকা যাবে কি না—তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। আকরাম আল-সুরানি আক্ষেপ করে বলেন, গাজাবাসীর স্বপ্ন এখন এতই ছোট হয়ে এসেছে যে, কেবল এক টুকরো রুটি জোগাড় করা, একটু চিকিৎসা বা শিক্ষার সুযোগ পাওয়াটাকেও বড় অর্জনের মতো উদযাপন করতে হয়।
(তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান)
এটিভি/ আরএম
(এই ওয়েবসাইটের যেকোনো কিছু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি)
© 2026, এশিয়ান অনলাইন টিভি  |  সর্বস্বত্ব সংরক্ষিতDeveloped by Future IT
Recent comments
Latest Comments section by users
No comment available