টাঙ্গাইল প্রতিনিধি: উন্নত জীবনের স্বপ্ন আর পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় গত ৭ মে রাশিয়ায় পাড়ি জমান টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার তিন যুবক। তবে কনস্ট্রাকশন ভিসায় দেশটিতে গেলেও সেখানে পৌঁছানোর পর তাদের জোরপূর্বক সামরিক কার্যক্রমে যুক্ত করে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগীরা হলেন গোপালপুর উপজেলার দক্ষিণ পাথালিয়া গ্রামের আমিনুল ইসলাম (৩০), মজিদপুর গ্রামের পবিত্র চন্দ্র (৩৫) এবং বীর নলহরা গ্রামের নজরুল ইসলাম (৪০)।
পরিবারের সদস্যরা জানান, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর একবার মাত্র তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছিলেন ওই তিন যুবক। পরে তাদের মোবাইল ফোন নিয়ে নেওয়া হয় এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ঈদের রাতে কৌশলে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমিনুল ইসলাম জানান, তাদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং দ্রুত উদ্ধার করা না হলে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হবে।
অন্যদিকে গত ২৯ মে রাতে স্ত্রী আছমা বেগমের সঙ্গে শেষবারের মতো কথা বলেন নজরুল ইসলাম। সে সময় তিনি জানান, তাকে এবং তার সঙ্গে থাকা আরও ৩০ বাংলাদেশিকে পাঁচজনের গ্রুপে ভাগ করে ছয়টি এলাকায় জোরপূর্বক যুদ্ধের কাজে পাঠানো হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাজধানীর নিকুঞ্জ-২ এলাকায় অবস্থিত জাবাল-ই-নূর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের মাধ্যমে কনস্ট্রাকশন ভিসায় রাশিয়ায় যান আমিনুল ইসলাম। তার পরিবারে রয়েছেন বৃদ্ধ মা, স্ত্রী ও তিন সন্তান। একই দিনে পবিত্র চন্দ্র বৃদ্ধ বাবা-মা, স্ত্রী ও দুই সন্তানকে রেখে বিদেশে যান। এছাড়া নজরুল ইসলাম তার বৃদ্ধ মা, স্ত্রী ও চার সন্তানকে রেখে রাশিয়ায় পাড়ি জমান।
পরিবারের সদস্যরা জানান, বিদেশে যাওয়ার জন্য তারা শেষ সম্বল বিক্রি করেছেন, ঋণ নিয়েছেন এবং সুদে টাকা ধার করে ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা পর্যন্ত এজেন্সিকে পরিশোধ করেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, জুলিয়া নামের এক রুশ নারীর মাধ্যমে ওই দিন ৩০ জন বাংলাদেশিকে রাশিয়ায় পাঠানো হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একটি হলরুমে রাশিয়ান সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে তাদের ব্রিফিং দেওয়া হচ্ছে। ভিডিওতে ওই নারীকে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়।
সরেজমিনে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ঈদের আনন্দের পরিবর্তে সেখানে বিরাজ করছে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও কান্নার পরিবেশ। পরিবারের সদস্যদের আশঙ্কা, একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিদের কোনো ক্ষতি হলে পরিবারগুলো চরম সংকটে পড়বে এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে যাবে।
তাদের দাবি, সরকার দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে রাশিয়ায় আটকে পড়া বাংলাদেশিদের উদ্ধার করুক এবং প্রতিশ্রুত কর্মস্থলে পাঠানোর ব্যবস্থা করুক। পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার পর থেকেই সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সির অফিস বন্ধ রয়েছে।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে এজেন্সিটির চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান তাদের সেনাবাহিনীতে যুক্ত করার বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে তিনি দাবি করেন, তাদের আর্মি থেকে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হবে এবং এরপর তারা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ওয়েলফেয়ার সেন্টারের দায়িত্বরত কর্মকর্তা সাকিব মাহমুদ বলেন, রাশিয়ায় পাঠানো ৩০ বাংলাদেশি নাগরিককে উদ্ধারে কাজ চলছে।
এদিকে ১ জুন রাতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে জানানো হয়, উচ্চ বেতন ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণামূলকভাবে ৩০ জন বাংলাদেশি যুবককে রাশিয়ায় পাঠানোর অভিযোগে তিনটি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল এবং জামানত বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
লাইসেন্স বাতিল হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- আর এস ইন্টারন্যাশনাল, জাবাল-ই-নূর ইন্টারন্যাশনাল এবং টিএস ওভারসিস লিমিটেড।
(এই ওয়েবসাইটের যেকোনো কিছু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি)
© 2026, এশিয়ান অনলাইন টিভি  |  সর্বস্বত্ব সংরক্ষিতDeveloped by Future IT
Recent comments
Latest Comments section by users
No comment available