আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে একের পর এক সামরিক চোখধাঁধানো কৌশল দেখিয়ে বিশ্বমঞ্চে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে ইরান। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক ঘাঁটিতে চালানো ধারাবাহিক সামরিক অভিযানে দেশটির অস্ত্রাগারে থাকা এমন এক মারাত্মক ড্রোন সামনে এসেছে, যা দেখে ঘুম হারাম হয়ে গেছে পশ্চিমা সামরিক বিশ্লেষকদের।
ড্রোনটির নাম ‘শাহেদ-২৩৮’। কম খরচে তৈরি হলেও এর অবিশ্বাস্য গতি ও ধ্বংসক্ষমতা আধুনিক মাল্টিলেয়ার্ড বা বহুদলীয় আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে এক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
ইরানের পুরোনো ও জনপ্রিয় শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের ভিত্তি ধরে তৈরি করা এই শাহেদ-২৩৮ সংস্করণটিতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে এর ইঞ্জিনে। এতদিন ধরে প্রপেলার চালিত পিস্টন ইঞ্জিন ব্যবহার করা হলেও এই নতুন মডেলে যুক্ত করা হয়েছে একটি শক্তিশালী কমপ্যাক্ট টার্বোজেট ইঞ্জিন।
ইরানের বিখ্যাত ‘শাহেদ এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রিজ’ ২০২৩ সালের নভেম্বরে প্রথম এই ঘাতক ড্রোনটির পর্দা উন্মোচন করে। তবে এটিকে প্রদর্শনীতেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি, খুব দ্রুততম সময়ে ছোট মাত্রায় উৎপাদন শুরু করে যুদ্ধের সরাসরি ময়দানে এটি নামিয়ে দেওয়া হয়।
শাহেদ-২৩৮-এর মূল জাদু লুকিয়ে আছে এর গতির মধ্যে। আগের শাহেদ-১৩৬ যেখানে প্রতি ঘণ্টায় মাত্র ১৮৫ কিলোমিটার গতিতে উড়তে পারত, সেখানে এই নতুন জেট চালিত ড্রোনটি ঘণ্টায় সহজে ৫০০ থেকে ৬০০ কিলোমিটার গতি তুলতে সক্ষম। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে চূড়ান্ত আঘাত হানার মুহূর্তে এর গতি প্রতি ঘণ্টায় ৭০০ কিলোমিটারও ছাড়িয়ে গেছে।
সাড়ে তিন মিটার দীর্ঘ এবং তিন মিটার ডানার এই ড্রোনটির উড্ডয়ন সর্বোচ্চ ৩০ হাজার ফুট পর্যন্ত হতে পারে এবং এটি ৫০ কেজি পর্যন্ত বিস্ফোরক বহন করতে পারে। যদিও পিস্টন ইঞ্জিনের বদলে জেট ইঞ্জিন বসানোর কারণে ড্রোনের জ্বালানি ধারণক্ষমতা এবং পাল্লা কিছুটা কমেছে, কিন্তু গতি ও আঘাতের সক্ষমতা কয়েক গুণ বাড়িয়ে ইরান শত্রুর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য প্রতিক্রিয়া জানানোর সময় প্রায় শূন্যের কোঠায় নিয়ে এসেছে।
ইরানের এই প্রযুক্তির কারণে প্রতিপক্ষের সব হিসাব-নিকাশ একদম ওলটপালট হয়ে গেছে। আধুনিক ইন্টারসেপ্টর বা প্রতিরোধ ব্যবস্থাগুলো মূলত তৈরি করা হয়েছিল ধীরগতির ড্রোনের গতিবিধি বিশ্লেষণ করে তা প্রতিহত করার জন্য। কিন্তু কোনো ড্রোন যখন ঘণ্টায় ৬০০ কিলোমিটার বেগে কোনো লক্ষ্যবস্তুর দিকে ছুটে আসে, তখন আকাশ প্রতিরক্ষা রাডারের পক্ষে তা শনাক্ত করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার জন্য কয়েক সেকেন্ডের বেশি সময় থাকে না। এর ওপর শত্রুর রাডার নেটওয়ার্ক ধ্বংস করার জন্য এতে ব্যবহার করা হয়েছে বিশেষ ইনফ্রারেড এবং রাডার-হোমিং প্রযুক্তি, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শত্রুর রাডার লক্ষ্য করে আঘাত হানতে পারে।
কৌশলগত দিক থেকে ড্রোনটিকে ইরান অর্থনৈতিক যুদ্ধের এক অন্যতম অস্ত্র বানিয়ে ফেলেছে। একেকটি সস্তা মূল্যের শাহেদ-২৩৮ ধ্বংস করতে গিয়ে শত্রুপক্ষকে কোটি কোটি টাকার উচ্চমানের ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র খরচ করতে হচ্ছে। আবার কোনো কোনো অভিযানে ধীরগতির শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের ঝাঁকের সাথে এই অতিগতির শাহেদ-২৩৮ ড্রোনকে মিলিয়ে ছুড়ে দেওয়া হয়, যা প্রতিপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষা প্রতিরক্ষাকে পুরোপুরি বিভ্রান্ত ও দিশেহারা করে তোলে।
বর্তমানে ইরানের কারখানাগুলো থেকে মাসে শত শত শাহেদ ড্রোন উৎপাদিত হচ্ছে, যার মধ্যে একটি বড় অংশ এই শাহেদ-২৩৮। এটি যুদ্ধক্ষেত্রে কতটা শেষ মুহূর্তের জয় এনে দেবে তা নিয়ে তর্ক থাকতে পারে, তবে অল্প খরচের কোনো ড্রোন কতটা ভয়ংকর রূপ নিতে পারে এবং এর দ্রুত গতি কীভাবে কোটি ডলারের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে নিমেষেই অকার্যকর করে দিতে পারে, তা শাহেদ-২৩৮ তৈরি করে বিশ্বকে বুঝিয়ে দিয়েছে ইরান।
সূত্র: প্রেস টিভি।
(এই ওয়েবসাইটের যেকোনো কিছু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি)
© 2026, এশিয়ান অনলাইন টিভি  |  সর্বস্বত্ব সংরক্ষিতDeveloped by Future IT
Recent comments
Latest Comments section by users
No comment available