আন্তর্জাতিক ডেস্ক: সামরিক পোশাকে নিয়মিত সেনাসদস্য নয়, হাতে অস্ত্রের প্রশিক্ষণ নিতে মাঠে নেমেছেন সাধারণ ইরানিরা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাতের আবহে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে এমন ব্যতিক্রমী মহড়া আয়োজন করেছে ইরান।
রাজধানী তেহরানে ১৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত এই কর্মসূচিতে হাজার হাজার পুরুষ ও নারী অংশ নেন।
‘জানফাদায়ান-ই ইরান’ বা ‘ইরানের জন্য আত্মত্যাগ’ নামে এই কর্মসূচির আয়োজন করে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর তেহরানভিত্তিক মোহাম্মদ রাসুলুল্লাহ সদর দপ্তর ও বাসিজ বাহিনী।
আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, কর্মসূচিতে অংশ নিতে ৫ লাখ মানুষ নিবন্ধন করেছিলেন। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের হিসাবে, সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য নিবন্ধনের সংখ্যা ৬ লাখ ছাড়িয়েছে। এসব সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ইরানের ১৯৮০-১৯৮৮ সালের ইরাক-ইরান যুদ্ধকে ‘পবিত্র প্রতিরক্ষা’ হিসেবে স্মরণ করার কয়েক দিন আগে এই মহড়া অনুষ্ঠিত হয়।
সাদ্দাম হোসেনের নেতৃত্বাধীন ইরাক ১৯৮০ সালে সদ্য প্রতিষ্ঠিত ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিল। চলতি বছর সেই যুদ্ধ শুরুর ৪৬ বছর পূর্ণ হয়েছে।
‘জানফাদায়ান-ই ইরান’ কর্মসূচিটি শুরু হয় ২০২৬ সালের মার্চে। এর উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে দেশের প্রতিরক্ষায় অংশ নিতে আগ্রহী বেসামরিক নাগরিকদের নিবন্ধন করা। শুরুতে এটি স্বেচ্ছাসেবীদের তালিকা তৈরির উদ্যোগ হলেও পরে বড় আকারের জনসম্পৃক্ত কর্মসূচিতে রূপ নেয়। দ্য ক্র্যাডল-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ প্রচারে ৩ কোটি ১৬ লাখের বেশি ইরানি নিবন্ধন করেছেন বলে কর্মকর্তারা দাবি করেছেন। তবে এই সংখ্যাটিও স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।
অভিযানে অংশ নেওয়া স্বেচ্ছাসেবীদের ৩২ শতাংশ নারী এবং তাদের অধিকাংশের বয়স ৪৬ বছরের নিচে বলে জানিয়েছেন কর্মসূচির মুখপাত্র সাসান জারে। সশস্ত্র বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে এই স্বেচ্ছাসেবীদের প্রতিরক্ষামূলক অভিযানে মোতায়েনের তথ্য না দিলেও দক্ষিণাঞ্চলের বন্দর ও পারস্য উপসাগরের দ্বীপগুলোর আশপাশে তাদের ব্যবহারের খবর পাওয়া গেছে।
ইরানের সামরিক পরিকল্পনাকারীরা এখন এই বিপুলসংখ্যক স্বেচ্ছাসেবীকে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষায় কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে কাজ করছেন। নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাত শুরু হলে শহর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষা, বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা এবং সশস্ত্র অস্থিরতা মোকাবিলায় তাদের ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে নিয়মিত সেনাবাহিনী ও ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বাইরের সামরিক হুমকিতে বেশি মনোযোগ দিতে পারবে বলে পরিকল্পনাকারীরা মনে করছেন।
এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে তেহরানের বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ নাগরিকদের সামরিক প্রস্তুতির প্রতি উৎসাহিত করে বিলবোর্ডও দেখা গেছে। কোথাও কাঁধ থেকে নিক্ষেপযোগ্য অস্ত্র, কোথাও স্নাইপার রাইফেলের ছবি দিয়ে নাগরিকদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে, তারা এসব অস্ত্র চালাতে জানেন কি না। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, স্বেচ্ছাসেবীদের ২৬ শতাংশ নিরাপত্তা ও সামরিক কাজে, ২০ শতাংশ ত্রাণ ও উদ্ধারকাজে এবং আরও ২০ শতাংশ সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ জানিয়েছেন।
মহড়ায় অংশ নেওয়া কয়েকজনের বক্তব্যেও দেশের প্রতি সমর্থনের কথা উঠে এসেছে। ৫৪ বছর বয়সী সাদিকেহ বলেন, শত্রুকে দেখাতে চান যে ইরানিরা এখনো মাঠে আছে এবং পিছু হটেনি। ৩৯ বছর বয়সী বেসরকারি চাকরিজীবী হোসেইন বলেন, এই কর্মসূচি বিশ্বের সামনে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শক্তি ও প্রতিরোধক্ষমতার চিত্র তুলে ধরছে। তেহরানের এক মসজিদের ইমাম বাহাদোরিও দেশের প্রতিরক্ষাকে ধর্মীয় দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত করে নিজের অংশগ্রহণের কথা জানিয়েছেন।
এদিকে তেহরানের কর্মসূচিকে দেশজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। আয়োজকদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রশিক্ষণ শেষে স্বেচ্ছাসেবীদের সারা দেশে ১ হাজারটি ‘জাতীয় প্রতিরোধ’ ব্যাটালিয়নে সংগঠিত করা হবে। এর মাধ্যমে যুদ্ধকালীন স্বেচ্ছাসেবী নিবন্ধনকে একটি সুসংগঠিত রিজার্ভ বাহিনীতে রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
১৮ সেপ্টেম্বরের তেহরান মহড়ায় বাসিজ সদস্য ও স্বেচ্ছাসেবীদের পাশাপাশি সামরিক সরঞ্জাম, ড্রোন ও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রদর্শন করা হয়। ইরান ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে রাষ্ট্রীয় আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই কর্মসূচিকে দেশটির সামরিক সক্ষমতা ও জনসমর্থন প্রদর্শনের একটি বড় আয়োজন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
সূত্র: দ্য ক্র্যাডল
(এই ওয়েবসাইটের যেকোনো কিছু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি)
© 2026, এশিয়ান অনলাইন টিভি  |  সর্বস্বত্ব সংরক্ষিতDeveloped by Future IT
Recent comments
Latest Comments section by users
No comment available