গাজীপুর (উত্তর) প্রতিনিধি: মানুষের বিবেক কখন জেগে ওঠে, তা বলা কঠিন। তবে যখন জাগে, তখন মাঝে মাঝে তা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে। ঠিক তেমনই এক অনন্য নজির স্থাপন করলেন গাজীপুরের শ্রীপুরের মো. মফিজুল ইসলাম (৬০)। প্রায় ৫০ বছর আগে কিশোর বয়সে রেলের টিকিট না কেটে ভ্রমণের সেই ‘ঋণ’ এখন পরিশোধ করলেন তিনি। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দিলেন ২০ হাজার টাকা।
মফিজুল ইসলাম গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার চন্নাপাড়া গ্রামের আব্দুল মান্নান বেপারির ছেলে। বর্তমানে তিনি বেপারিবাড়ি ফাতেমাতুয যাহেরা মহিলা মাদ্রাসা পরিচালনা করছেন। তিনি এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা। পাঁচ সন্তানের জনক মফিজুল ইসলামের এই সততা এখন এলাকায় মুখে মুখে। রেল কর্তৃপক্ষও তার এই কাজে খুশি।


এ প্রসঙ্গে কথা হয় মফিজুল ইসলামের সঙ্গে। ঘটনাটি ১৯৭৬ থেকে ১৯৭৮ সালের। তখন মফিজুল জীবিকার তাগিদে শুরু করেছিলেন কাঁঠালের ব্যাবসা। শ্রীপুর থেকে ট্রেনের ছাদে চড়ে ঢাকায় কাঁঠাল নিয়ে যেতেন তিনি। মফিজুল জানান, সেই সময়ে ট্রেনের ছাদে যাতায়াতের জন্য কোনো টিকিট কাটতেন না তিনি। পরিবর্তে ট্রেনের দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের হাতে ধরিয়ে দিতেন ১-২ টাকা। এভাবেই চলত নিয়মিত যাতায়াত। কিন্তু রেলওয়ের কোষাগারে জমা হতো না কোনো অর্থ। দীর্ঘ পাঁচ দশক পর এসে মফিজুল ইসলাম অনুভব করেন, সেই সময় দেওয়া ১ টাকা পুলিশের পকেটে গেলেও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ কিন্তু তাদের পাওনা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

তিনি বলেন, "দুই-তিন বছর টিকিট ছাড়াই যাতায়াত করছি। পুলিশের হাতে টাকা দিয়েছি ঠিকই, কিন্তু রেল কোম্পানি তো আমার কাছে টাকা পায়। অনেকদিন ধরেই মনে হচ্ছিল, এই টাকাটা আমার পরিশোধ করা দরকার। বিবেকের কাছে আমি দায়বদ্ধ ছিলাম।"
এই দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি ছুটে যান শ্রীপুর রেলওয়ে স্টেশনে। সহকারী স্টেশন মাস্টারকে অনুরোধ করেন তাকে ২০ হাজার টাকার টিকিট দেওয়ার জন্য। তবে একসঙ্গে এত টাকার টিকিট স্টকে না থাকায় বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। এক সপ্তাহ অপেক্ষার পর মফিজুল ইসলাম আবারও স্টেশনে যান। অবশেষে গত ২৮শে মার্চ রেলওয়ের বিশেষ রশিদের (মানি রিসিট) মাধ্যমে তিনি ২০ হাজার টাকা জমা দিয়ে দায়মুক্ত হন।
শ্রীপুর রেল স্টেশন মাস্টার মো. সাইদুর রহমান বলেন, রেলওয়েতে এভাবে পুরোনো বকেয়া বা দায়মুক্তির টাকা পরিশোধের আইনি বিধান রয়েছে। তিনি বলেন, "মফিজুল সাহেব এসে যখন বিষয়টি খুলে বললেন, আমরা তার মানসিকতায় মুগ্ধ হয়েছি। জীবনের এক পর্যায়ে যখন তিনি নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন এবং দায়মুক্ত হতে চেয়েছেন, তা অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। এটি সত্যিই একটি চমৎকার মানসিকতার দৃষ্টান্ত।
(এই ওয়েবসাইটের যেকোনো কিছু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি)
© 2026, এশিয়ান অনলাইন টিভি  |  সর্বস্বত্ব সংরক্ষিতDeveloped by Future IT
Recent comments
Latest Comments section by users
No comment available