ডেস্ক রিপোর্ট: আজ ৫ আগস্ট। জুলাই বিপ্লবীদের ভাষায় ‘৩৬ জুলাই’। দুই বছর আগে ২০২৪ সালের এই দিনে ছাত্র-জনতার রক্তস্নাত অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেড় দশকের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের আত্মত্যাগে অর্জিত সেই দিনটি আজ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় স্মরণ করছে দেশ।
রাষ্ট্রীয় ছুটি, শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের উদ্বোধন, শহীদ পরিবারের সদস্য ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনাসহ নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান’ দিবস। এই আন্দোলনকে কেউ ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান’, কেউ ‘বর্ষা বিপ্লব’, আবার কেউ ‘দুনিয়া কাঁপানো জুলাই বিপ্লব’ হিসেবে অভিহিত করেন। চিত্র-চরিত্র, সময় ও বাস্তবতা ভিন্ন হলেও অনেকের মতে, এ আন্দোলন ইতিহাসের বিভিন্ন গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি জাগিয়ে তোলে। তবে দিবসটি ঘিরে একটি প্রশ্নও সামনে এসেছে—জুলাইয়ের স্বপ্নের বাংলাদেশ কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে?
বিশিষ্টজনদের মতে, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশে এত ব্যাপক জনসম্পৃক্ত আন্দোলন এবং তার এমন পরিণতি বিরল। তাদের ভাষায়, শত শত প্রাণের আত্মত্যাগ ও লাখো মানুষের অংশগ্রহণ শুধু একটি সরকারের পতনই ঘটায়নি, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের অবসান ঘটিয়ে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা করেছে। এ ঘটনা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম, জাতিসংঘসহ বিশ্ব সম্প্রদায়েরও দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
দিবসটি উপলক্ষে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণী দিয়েছেন।
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, মহান জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে মহান স্বাধীনতাযুদ্ধ ও গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের স্বপ্ন ও আদর্শ বাস্তবায়নে সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বাণীতে বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান এবং জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার এক ঐতিহাসিক বিজয়। তিনি বলেন, এ বিজয় ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের ফসল। এত ত্যাগের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা জাতীয় ঐক্য রক্ষা করতে হবে এবং বাংলাদেশে আর কখনো স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদ, চরমপন্থা কিংবা উগ্রবাদের উত্থান ঘটতে দেওয়া যাবে না।
তিনি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে দেশের সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে আত্মত্যাগকারী শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিটি শহীদ পরিবারের কাছে বাংলাদেশ ঋণী। এখন সেই ঋণ পরিশোধের সময়। তার ভাষায়, ১৯৭১ ছিল স্বাধীনতা অর্জনের যুদ্ধ, আর ২০২৪ ছিল স্বাধীনতা ও জনগণের অধিকার রক্ষার সংগ্রাম। তাই ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদেরও জাতি কখনো ভুলবে না।
দুই বছর পরও জুলাই অভ্যুত্থানের আত্মত্যাগ নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়ে গেছে। আন্দোলনে নিহতদের পরিবার এবং আহতদের অনেকেই এখনো ন্যায়বিচার, পুনর্বাসন ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির প্রত্যাশা করছেন। যে শিশু, কিশোর ও তরুণেরা একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নে প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন, তাদের সেই স্বপ্ন কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে—এ প্রশ্নও উচ্চারিত হচ্ছে বিভিন্ন মহলে।
এ বিষয়ে মঙ্গলবার এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, চারদিকে জুলাই যোদ্ধাদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে, যা জুলাইয়ের চেতনার পরিপন্থী। তিনি সবাইকে নৈতিক অবস্থান থেকে জুলাইয়ের আদর্শ বাস্তবায়নে সাহসী ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন বলেন, সহস্র শহীদের আত্মত্যাগকে সার্থক করতে হলে দেশকে সাম্প্রদায়িকতা, শোষণ, বৈষম্য ও সাম্রাজ্যবাদী প্রভাবমুক্ত করতে হবে। তার মতে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত জুলাই আন্দোলনের লক্ষ্য পূর্ণতা পাবে না।
দিবসটি উপলক্ষে আজ সরকারি ছুটির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি পর্যায়ে নানা কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনও পৃথক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি: আজ দেশের ৬৪ জেলায় জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হবে। সকাল ৯টায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের উদ্বোধন করবেন। বেলা ১১টায় বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে শহীদ পরিবারের সদস্য ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা এবং আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রমের।
এছাড়া দেশের সব জেলায় আলোচনা সভা ও সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। ঢাকাসহ সব সিটি করপোরেশনের মিনিপোলে জুলাই আন্দোলনের দুর্লভ আলোকচিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হবে। বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার এবং বেসরকারি গণমাধ্যমগুলো বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করবে। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আলোচনা সভা, রচনা, আবৃত্তি ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন থাকবে। বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোতেও দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হবে।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোয় বিশেষ দোয়া ও প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে। ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন শহরের প্রধান সড়ক জাতীয় পতাকা, ব্যানার, ফেস্টুন ও আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে স্মারক ডাকটিকিটও প্রকাশ করা হবে।
সরকারি ও বেসরকারি জাদুঘরগুলো আজ বিনা টিকিটে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে। শিশুদের জন্য সরকারি-বেসরকারি বিনোদনকেন্দ্রেও বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া সরকারি হাসপাতাল, কারাগার, সরকারি শিশু পরিবার, শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র, প্রতিবন্ধী কল্যাণ কেন্দ্র, ডে-কেয়ার সেন্টার ও ভবঘুরে আশ্রয়কেন্দ্রে বিশেষ প্রীতিভোজের আয়োজন করা হয়েছে।
এনসিপির কনসার্ট: রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে বিকেল সাড়ে ৩টায় ‘বর্ষা বিপ্লবের গান’ শীর্ষক কনসার্ট অনুষ্ঠিত হবে। মুনসুন কালচারাল অ্যালায়েন্সের উদ্যোগে আয়োজিত এ কনসার্টে পারসা, কুঁড়েঘর, আর্বোভাইরাস, এভয়েড রাফা, শিরোনামহীন, আর্ক (হাসান) ও আর্টসেল ব্যান্ড সংগীত পরিবেশন করবে। একক পরিবেশনায় থাকবেন সেজান ও আসিফ আকবর। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
জামায়াতের কর্মসূচি: বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সকালে রাজধানীর পল্টনে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে সমাবেশ করবে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে সারা দেশে সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হবে। দলটির মহিলা বিভাগ, ছাত্র সংগঠন এবং জুলাই যোদ্ধাদের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মও পৃথক কর্মসূচি পালন করবে।
যুক্তফ্রন্টের আলোচনা সভা: বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট আজ বিকেল ৪টায় তোপখানা সড়কের শিশু কল্যাণ পরিষদ মিলনায়তনে আলোচনা সভার আয়োজন করেছে। এছাড়া ৭ আগস্ট বিকেল ৫টায় মুক্তি ভবনের মৈত্রী মিলনায়তনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগে আরেকটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।
(এই ওয়েবসাইটের যেকোনো কিছু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি)
© 2026, এশিয়ান অনলাইন টিভি  |  সর্বস্বত্ব সংরক্ষিতDeveloped by Future IT
Recent comments
Latest Comments section by users
No comment available