ডেস্ক রিপোর্ট: রক্তস্নাত ঐতিহাসিক ২১ ফেব্রুয়ারি আজ। মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। পলাশ-শিমুল ফোটার এই দিনে বাঙালি জাতি বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে সেইসব বীর সন্তানদের, যারা মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় ১৯৫২ সালের এই দিনে অকাতরে প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন। বাঙালির প্রাণের এই দিনে আজও ধ্বনিত হয় সেই কালজয়ী গান— ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি?’

বায়ান্নর সেই উত্তাল দিনে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে রাজপথে নামা ছাত্রদের ওপর তৎকালীন পুলিশের গুলিবর্ষণের মধ্য দিয়ে রচিত হয় এক অনন্য ইতিহাস। ভাষা আন্দোলনের ৭৪ বছর পূর্ণ হওয়ার এই দিনে সালাম, বরকত, রফিক, শফিউর ও জব্বারসহ নাম না জানা শহীদদের গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে জাতি। তাদের আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। পরবর্তীতে ২০১০ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ দিবসটি পালনের প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে গ্রহণ করে। আজ সারা বিশ্বে যথাযোগ্য মর্যাদায় দিনটি পালিত হচ্ছে।


একুশের প্রথম প্রহর রাত ১২টা ১ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার-এ পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে দিবসের কর্মসূচি শুরু হয়। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে নেওয়া হয়েছে নানা কর্মসূচি। বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন কালো ব্যাজ ধারণ, প্রভাতফেরি ও আলোচনা সভার আয়োজন করেছে।
বাঙালি জাতি ও বাংলা ভাষাভাষীদের জন্য দিনটি একই সঙ্গে শোক ও গৌরবের। মাতৃভাষার জন্য প্রাণদানের এমন নজির বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। ভাষা শহীদদের স্মরণ করার পাশাপাশি বাংলা ভাষার মর্যাদা সমুন্নত রাখার অঙ্গীকারে আজ একতাবদ্ধ জাতি।
একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে আজ সরকারি ছুটি। দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে এবং উত্তোলন করা হয়েছে কালো পতাকা। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণী দিয়েছেন।
১৯৪৭ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরের দিকে তৎকালীন পূর্ব বাংলার রাজধানী ঢাকায় প্রথম ভাষা-বিক্ষোভ শুরু হয়। ১৯৪৮ সালের মার্চে আন্দোলন সীমিত পরিসরে গড়ে ওঠে এবং ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তা চরম রূপ নেয়। সেদিন সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজপথে বের হলে পুলিশ গুলি চালায়। এতে কয়েকজন ছাত্র শহীদ হন।
পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি ছাত্রদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও প্রতিবাদে রাজপথে নেমে আসেন। তারা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে শহীদদের গায়েবি জানাজায় অংশ নেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতারাতি সেখানে একটি অস্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়, যা ২৬ ফেব্রুয়ারি সরকার গুঁড়িয়ে দেয়। কিন্তু এ দমন-পীড়ন আন্দোলনকে আরও বেগবান করে তোলে।
১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়লাভের পর ৭ মে গণপরিষদের অধিবেশনে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ১৯৫৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি সংবিধানে সংশোধন এনে বাংলাকে পাকিস্তানের দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৮৭ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে ‘বাংলা ভাষা প্রচলন বিল’ পাস হয় এবং ৮ মার্চ থেকে তা কার্যকর করা হয়।
১৯৯৮ সালে কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে বসবাসরত দুই বাঙালি রফিকুল ইসলাম ও আব্দুস সালাম একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণার আবেদন জানান। পরে ‘মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ লাভার্স অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলে তারা বিভিন্ন দেশের সমর্থন আদায়ে কাজ করেন।
বাংলাদেশের উদ্যোগে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর প্যারিসে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কো-এর সাধারণ সম্মেলনে প্রস্তাবটি উত্থাপন করা হয় এবং বিপুল সমর্থনে তা গৃহীত হয়। এরপর থেকে ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হচ্ছে। ২০১০ সালের ২১ অক্টোবর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ-এর ৬৫তম অধিবেশনে প্রতিবছর দিবসটি পালনের প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে পাস হয়।
মহান একুশ আমাদের চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ— ভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের ভিত্তি। শহীদদের আত্মত্যাগ আমাদের প্রেরণা জোগায় মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় সদা সচেষ্ট থাকতে।
(এই ওয়েবসাইটের যেকোনো কিছু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি)
© 2026, এশিয়ান অনলাইন টিভি  |  সর্বস্বত্ব সংরক্ষিতDeveloped by Future IT
Recent comments
Latest Comments section by users
No comment available