আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে চালানো সন্ত্রাসী হামলার ২৫ বছর পূর্ণ হলো আজ। ওই দিন আল-কায়েদার ১৯ সদস্য চারটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ ছিনতাই করে হামলা চালায়। দুটি উড়োজাহাজ নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ারে আঘাত হানে। তৃতীয়টি ওয়াশিংটনের পেন্টাগনে আঘাত করে। চতুর্থ উড়োজাহাজটি পেনসিলভানিয়ায় বিধ্বস্ত হয়। হামলায় নিহত হন ২ হাজার ৯৭৭ জন।
এক দিনের এই হামলা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থাই বদলে দেয়নি; এর প্রভাব পড়ে বিশ্বরাজনীতি, যুদ্ধনীতি, গোয়েন্দা তৎপরতা ও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতেও।
হামলার নেতৃত্বে ছিল ওসামা বিন লাদেনের নেতৃত্বাধীন আল-কায়েদা। তবে ৯/১১ ছিল দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার ফল। এর আগে ১৯৯৮ সালে কেনিয়া ও তানজানিয়ায় মার্কিন দূতাবাসে বোমা হামলা এবং ২০০০ সালে ইয়েমেনের উপকূলে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস কোল-এ হামলা চালিয়েছিল সংগঠনটি।
হামলার আগে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে আল-কায়েদার তৎপরতা ও সম্ভাব্য হামলা নিয়ে বিভিন্ন তথ্য ছিল। কিন্তু সিআইএ, এফবিআইসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্যের যথাযথ সমন্বয় হয়নি। ৯/১১ কমিশনের তদন্তে দেখা যায়, বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ একত্র করে সম্ভাব্য হুমকির পূর্ণ চিত্র তৈরি করা সম্ভব হয়নি।
হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান জোরদার করে। ২০০১ সালের অক্টোবরে আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু করে দেশটি। আল-কায়েদাকে দমন এবং তালেবান সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানো ছিল এর অন্যতম লক্ষ্য। পরে ২০০৩ সালে ইরাকে সামরিক অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা।
এরপর প্রায় দুই দশক ধরে আফগানিস্তান ও ইরাকে যুদ্ধ চলে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসবিরোধী নজরদারি, গোয়েন্দা তৎপরতা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ব্যাপকভাবে বাড়ানো হয়। গুয়ানতানামো বে-তে বন্দিদের আটক রাখা এবং আফগানিস্তান ও ইরাকে বন্দিদের সঙ্গে আচরণ নিয়ে মানবাধিকার প্রশ্নেও তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়।
৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা কাঠামোতেও বড় পরিবর্তন আসে। সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য ন্যাশনাল কাউন্টার টেররিজম সেন্টার গড়ে তোলা হয় এবং পরবর্তীতে ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের পদ সৃষ্টি করা হয়। গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি ও বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়।
২৫ বছর পর যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১-এর মতো মাত্রার কোনো বিদেশি-নির্দেশিত হামলা আর ঘটেনি। তবে সন্ত্রাসী হুমকির ধরন বদলেছে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এখন এককভাবে হামলা চালানো ব্যক্তি বা ছোট গোষ্ঠী, অনলাইন উগ্রবাদ এবং বিভিন্ন ধরনের উগ্রপন্থী মতাদর্শ বড় উদ্বেগের বিষয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ৯/১১-এর পর গড়ে ওঠা সন্ত্রাসবিরোধী কাঠামো বড় ধরনের বিদেশি-নির্দেশিত হামলা চালানো কঠিন করে তুলেছে। তবে হুমকির ধরন পরিবর্তিত হওয়ায় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকেও নতুন বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের কৌশল মানিয়ে নিতে হচ্ছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অগ্রাধিকারও বদলেছে। সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার পাশাপাশি রাশিয়া, চীন ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় হুমকি এখন মার্কিন নিরাপত্তা নীতিতে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে সন্ত্রাসবিরোধী সক্ষমতা ও গোয়েন্দা তৎপরতায় ভবিষ্যতে কোনো ঘাটতি তৈরি হচ্ছে কি না, তা নিয়েও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।
৯/১১-এর ২৫ বছর পর সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়ে থাকছে—শুধু গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করাই যথেষ্ট নয়; বিভিন্ন সংস্থার তথ্য যথাসময়ে ভাগাভাগি করা, সেগুলোর গুরুত্ব অনুধাবন করা এবং সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ৯/১১ কমিশনের তদন্তে তথ্যের সমন্বয়হীনতাকে যে বড় দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, বর্তমান নিরাপত্তা বাস্তবতায় সেই শিক্ষাই আবার সামনে এসেছে।
(এই ওয়েবসাইটের যেকোনো কিছু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি)
© 2026, এশিয়ান অনলাইন টিভি  |  সর্বস্বত্ব সংরক্ষিতDeveloped by Future IT
Recent comments
Latest Comments section by users
No comment available