আন্তর্জাতিক ডেস্ক: চার স্ত্রী ও ৫৮ সন্তান নিয়ে আফগানিস্তানের মোহাম্মদ সাদিকের সংসার। ৫৭ বছর বয়সী এই ব্যক্তি একটি গাড়ির শোরুমে কাজ করে বিশাল পরিবারের ভরণপোষণের চেষ্টা করছেন। কিন্তু সীমিত আয়ে প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খেতে হয় তাকে। সন্তানদের যেন ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমাতে না হয় এবং সবাই যেন শিক্ষার সুযোগ পায়—এটাই এখন তার সবচেয়ে বড় চাওয়া।
আফগানিস্তানের উরুজগান প্রদেশের বাসিন্দা সাদিকের পরিবার দেশটির অন্যতম বড় পরিবার হিসেবে পরিচিত। কয়েক সপ্তাহ আগে তাঁর সর্বকনিষ্ঠ সন্তানের জন্ম হয়েছে। এত বড় পরিবারের ব্যয় সামলাতে গিয়ে নিয়মিত আর্থিক সংকটে পড়ছেন তিনি।
সাদিক জানান, প্রতিটি গাড়ি বিক্রির জন্য তিনি মাত্র এক হাজার আফগানি কমিশন পান। এই সামান্য আয় দিয়ে পরিবারের সদস্যদের খাবার, পোশাক ও শিক্ষার খরচ মেটানো কঠিন। পরিবারের ব্যয় সামলাতে তার অনেক সন্তানও কাগজ, প্লাস্টিক ও অন্যান্য পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ সংগ্রহ করে। এসব উপকরণ বিক্রি করে পরিবারের খরচে অবদান রাখে তারা।
সন্তানদের নাম ভুলে যান, রাতে গুনে দেখেন সবাইকে
সন্তানের সংখ্যা এত বেশি যে মাঝেমধ্যে অনেকের নাম মনে রাখতে পারেন না সাদিক। তাদের কাউকে নাম ধরে না ডেকে ‘বাবা’ কিংবা ‘আমার সন্তান’ বলে সম্বোধন করেন তিনি। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে সন্তানদের গুনে দেখেন, সবাই বাড়িতে ফিরেছে কি না।
একবার রাতের খাবারের সময় সন্তানদের গুনতে গিয়ে একজনকে অনুপস্থিত দেখতে পান। কিন্তু সেই সন্তান ছেলে, নাকি মেয়ে, তা-ও মনে করতে পারেননি। পরে জানতে পারেন, তাকে নানির বাড়িতে পাঠানো হয়েছে।
মেয়ের বিয়ের সময়ও এমন ঘটনা ঘটে। বিয়ে পড়াতে আসা মৌলভি মেয়ের নাম জানতে চাইলে সাদিক ভুল করে অন্য এক মেয়ের নাম বলেন। ঘটনাটি স্মরণ করে সাদিক বলেন, ‘যে মৌলভি সাহেব বিয়ে পড়িয়েছিলেন, তিনি আমাকে আমার মেয়ের নাম জিজ্ঞেস করেছিলেন। আমি কিছুক্ষণ চিন্তা করে ভুলবশত আমার অন্য এক মেয়ের নাম বলে ফেলি। তখন মৌলভি সাহেব হেসে বললেন, আপনি বাড়ি গিয়ে আবার দেখে আসুন, ভুল নাম বলেছেন কি না।’
সাদিকের ভাষায়, ছোট সন্তানরা তাকে ঘিরে জড়ো হলে বাড়িটি যেন উৎসবের জায়গায় পরিণত হয়। তবে আনন্দের আড়ালে রয়েছে অভাবের কঠিন বাস্তবতা। পরিবারের সদস্যদের জন্য দিনে দুবার—সকালে ও সন্ধ্যায়—রান্না হয়। তবু কখনো কখনো খাবারের অভাবে সন্তানদের ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমাতে যেতে হয়।
অল্প বয়সে বিয়ে, ১৪ সন্তান হারানোর বেদনা
সাদিকের প্রথম বিয়ে হয় ২০ বছর বয়সে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, চার স্ত্রীকে বিয়ে করার সময় তাঁদের বয়স ছিল ১৩ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে। বিয়ের জন্য কনের পরিবারকে দেওয়ার অর্থ জোগাড় করতে তাকে কয়েক বছর ধরে সঞ্চয় করতে হয়েছে।
বড় পরিবারের পেছনে নিজের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, তার একমাত্র লক্ষ্য ছিল ‘নবীর অনুসারীর সংখ্যা বাড়ানো।’
তবে এই পরিবারের জীবনে আনন্দের পাশাপাশি রয়েছে গভীর শোকও। সাদিক ও তার স্ত্রীরা বছরের পর বছর ধরে ১৪ সন্তান হারিয়েছেন।
এক কম্বলের নিচে ছয়-সাতজনের রাত
দারিদ্র্যের কারণে সাদিকের পরিবারের বসবাসের পরিবেশও অত্যন্ত কষ্টকর। শীতের রাতে কখনো ছয়-সাতজনকে একটি পাতলা কম্বলের নিচে ঘুমাতে হয়। বাড়ির কক্ষগুলোতে জানালা নেই, মজবুত দরজাও নেই। প্রবেশপথে ঝোলানো রয়েছে একটি পাতলা পর্দা। শীতের সময় কাগজ ও সহজলভ্য অন্যান্য উপকরণ পুড়িয়ে ঘর গরম রাখেন তারা।
পরিবারের সদস্যদের গোসল, কাপড় ও বাসন ধোয়ার পাশাপাশি শৌচাগারের কাজেও একই জায়গা ব্যবহার করা হয়। এমন প্রতিকূলতার মধ্যেও সন্তানদের পড়াশোনার সুযোগ করে দিতে চান সাদিক। নিজে পড়াশোনা করতে পারেননি বলে সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর ব্যাপারে তার আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু অর্থের অভাবে শিক্ষার খরচ জোগানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
পরিবারের ব্যয় সামলাতে সরকার, সহায়তা সংস্থা ও আর্থিকভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের কাছে সাহায্য চেয়েছেন তিনি।
সাদিকের প্রত্যাশা খুব বেশি নয়। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের সবচেয়ে বড় দুটি ইচ্ছার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার প্রথম ইচ্ছা, আমার সন্তানরা শিক্ষা লাভ করুক, ধর্ম এবং পৃথিবী সম্পর্কে জানুক। দ্বিতীয়ত, তাদের যেন কখনও ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমাতে না হয় এবং তাদের পেট যেন ভরা থাকে।’ সূত্র: বিবিসি
এটিভি/এসআইআর
(এই ওয়েবসাইটের যেকোনো কিছু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি)
© 2026, এশিয়ান অনলাইন টিভি  |  সর্বস্বত্ব সংরক্ষিতDeveloped by Future IT
Recent comments
Latest Comments section by users
No comment available