আন্তর্জাতিক ডেস্ক: সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে টানা তৃতীয় দিনের মতো ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা। আর ইয়েমেন থেকে এই হামলার এই দাবির মধ্যেই রিয়াদে দফায় দফায় শক্তিশালী বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। যদিও এই হামলা প্রতিহত করার দাবি করেছে ইয়েমেনে লড়াইরত সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, ১২ অক্টোবর সোমবার রিয়াদ এবং খামিস মুশাইতের দিকে ছোড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে বলে সৌদি জোট জানিয়েছে। এর আগে কয়েক দিনের হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছেন। বন্ধ রয়েছে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। হামলার পর দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে, আর সৌদি বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনাগুলোতে আরও হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছে হুতিরা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক বিবৃতিতে জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি বলেন, হুতিরা রিয়াদের দিকে একটি এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর খামিস মুশাইতের দিকে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। তিনটি ক্ষেপণাস্ত্রই প্রতিহত করে ধ্বংস করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
অবশ্য আল জাজিরা বলছে, সোমবার রাতে রিয়াদের বাসিন্দারা বেশ কয়েকটি একাধিক শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন। এর কিছুক্ষণ আগে তাদের মুঠোফোনে আকাশপথে হামলার আশঙ্কা জানিয়ে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছিল।
অন্যদিকে ইয়েমেনের রাজধানী সানাসহ জনবহুল এলাকাগুলোর নিয়ন্ত্রণে থাকা হুতিরা জানিয়েছে, রিয়াদে তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।
হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেন, ইয়েমেন সীমান্তের কাছে খামিস মুশাইতের সামরিক বিমানঘাঁটিতেও ড্রোন হামলা চালিয়েছে তারা। সৌদি আরবের মক্কা ও মদিনা ছাড়া অন্য শহরগুলোর বিমানবন্দরে ফ্লাইট পরিচালনা না করতে আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা ও যাত্রীদের আবারও সতর্ক করেছেন তিনি। তার দাবি, এসব বিমানবন্দর এখন ‘নিরাপদ নয়’।
এর আগে শনিবার হুতিদের হামলায় রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অন্তত ১৩ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হন। এরপর থেকেই বিমানবন্দরটি বন্ধ রয়েছে। রোববারের আরেকটি হামলায় একজন নিহত ও ১১ জন আহত হন।
সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগামী শনিবার পর্যন্ত বিমানবন্দরটি বন্ধ থাকবে। এ কারণে বিভিন্ন বিমান সংস্থা তাদের ফ্লাইট বাতিল করেছে। সৌদি আরবের তেল স্থাপনাগুলোতেও হামলা চালিয়ে যাচ্ছে হুতিরা।
ইয়েমেনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সমর্থক বাহিনীর সঙ্গে লড়ছে হুতিরা। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট হুতিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালানোর পাশাপাশি ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে স্থলযুদ্ধে সহায়তা করছে। ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়লে এই সংঘাতও তীব্র হয়ে ওঠে।
এদিকে রিয়াদে এক জ্বালানি সম্মেলনে সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুল আজিজ বিন সালমান আল সৌদ বলেন, গত এক সপ্তাহে বিমানবন্দরগুলোতে হামলা দেশটির সংকট মোকাবিলার সক্ষমতার বড় পরীক্ষা নিয়েছে। তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোর ঘটনাগুলো গুরুতর। আমাদের প্রতিক্রিয়াও সমানভাবে কঠোর হতে হবে।’
সৌদি অর্থনীতিকে বহুমুখী করার লক্ষ্যে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নেয়া ‘ভিশন ২০৩০’ পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এ পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে হবে। বিনিয়োগও অব্যাহত রাখতে হবে।’
এদিকে সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কেন ধারাবাহিক হামলা ঠেকাতে পারছে না, তা তদন্ত করছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বার্তাসংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) এ তথ্য জানিয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যের দুই কর্মকর্তা।
ওই কর্মকর্তারা জানান, প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, হুতিরা প্রথমে কয়েকটি ড্রোন পাঠিয়ে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য পথ তৈরি করে। এরপর ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের একটি সমন্বিত হামলা চালানো হয়, যার কয়েকটি বিমানবন্দরে পৌঁছে যায়।
হুতিদের হাতে এমন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যেগুলোর ওয়ারহেড উড্ডয়নের সময় গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে। ফলে সৌদি আরবের ব্যবহৃত প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থাসহ অন্যান্য প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য এগুলো ঠেকানো কঠিন হয়ে উঠছে।
এপিকে এক কর্মকর্তা বলেন, হামলার বিষয়ে আরও আগে সতর্কবার্তা কেন দেয়া যায়নি, তা-ও খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনগুলো এক হাজার কিলোমিটারেরও বেশি পথ পাড়ি দিয়ে রিয়াদে পৌঁছেছিল।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুতিদের সমালোচনা করলেও ওয়াশিংটন এ সংঘাতে হস্তক্ষেপ করবে কি না, সে বিষয়ে কোনো ইঙ্গিত দেননি। হুতিদের বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেবেন—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘হুতিরা খুব খারাপ আচরণ করছে। এটা ভালো নয়।’
তবে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে জড়ালে পাল্টা হামলা চালানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন হুতিদের এক কর্মকর্তা।
গোষ্ঠীটির রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ আল-বুখাইতি বার্তাসংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যদি ইয়েমেনের বিরুদ্ধে আগ্রাসনে জড়ায়, তাহলে পাল্টা জবাব দেয়া হবে কি না, তা নিয়ে আমরা সময় নষ্ট করব না। বরং যুক্তরাষ্ট্র ও এ অঞ্চলে তাদের সব স্বার্থকে লক্ষ্য করে দ্রুত ও যন্ত্রণাদায়ক জবাব দেয়া হবে।’
আল-বুখাইতি সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও বিমানবন্দরে কর্মরত সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকেও এসব স্থাপনা থেকে দূরে থাকার সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তার দাবি, এসব স্থাপনা এখন ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হয়ে উঠেছে।
সূত্র: আল-জাজিরা
(এই ওয়েবসাইটের যেকোনো কিছু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি)
© 2026, এশিয়ান অনলাইন টিভি  |  সর্বস্বত্ব সংরক্ষিতDeveloped by Future IT
Recent comments
Latest Comments section by users
No comment available