অনলাইন ডেস্ক: মার্কিন–ইসরায়েলি হামলায় আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার খবর ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম নিশ্চিত করার পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় জীবনের অধ্যায়। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ছিলেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা। এটি একটি পদ, যা শুধু ধর্মীয় মর্যাদার নয়, রাষ্ট্রীয় সর্বময় ক্ষমতার প্রতীক।
ইরানের শাসনব্যবস্থায় ‘সর্বোচ্চ নেতা’ কেবল ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব নন। তিনি সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণের চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ এবং গুরুত্বপূর্ণ সব প্রতিষ্ঠানের ওপর নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তি। প্রেসিডেন্ট ও সংসদ নির্বাচিত হলেও চূড়ান্ত ক্ষমতা থাকে সর্বোচ্চ নেতার হাতে।


১৯৩৯ সালে ইরানের শিয়া অধ্যুষিত নগরী মাশহাদে জন্ম নেন খামেনি। ধর্মীয় পরিবারে বেড়ে ওঠা এই নেতা ছোটবেলা থেকেই কোরআন শিক্ষার মাধ্যমে পড়াশোনা শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি উচ্চতর ধর্মতাত্ত্বিক শিক্ষা নেন ইরানের কুম এবং ইরাকের নাজাফে।

কুমে অধ্যয়নকালে তিনি ঘনিষ্ঠ হন আয়াতুল্লাহ রুহোল্লাহ খোমেনির সঙ্গে, যিনি পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের নেতৃত্ব দেন। সেসময় থেকেই রাজতন্ত্রবিরোধী রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন খামেনি।

১৯৫৩ সালে ব্রিটিশ এমআই৬ ও মার্কিন সিআইএ সমর্থিত অভ্যুত্থানে প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর পাহলভি রাজতন্ত্র শক্তিশালী হয়। সেই সময় থেকেই বিরোধী রাজনীতিতে যুক্ত হন খামেনি। শাহের গোপন পুলিশ সাভাক তাকে একাধিকবার গ্রেফতার করে এবং নির্বাসনেও পাঠায়।
১৯৭৮-৭৯ সালের গণআন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে তিনি ইসলামী বিপ্লব পরবর্তী রাষ্ট্র কাঠামো গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় আসেন।
১৯৮১ সালে বিরোধী গোষ্ঠী মোজাহেদিন-ই-খালক এর হামলায় আহত হলেও প্রাণে বেঁচে যান খামেনি। তবে তার ডান হাত আংশিক অকার্যকর হয়ে পড়ে। একই বছর তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর তিনি দেশের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর থেকেই কার্যত ইরানের রাজনীতি, সামরিক নীতি ও কৌশলগত সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করেন।
তার নেতৃত্বে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) একটি সাধারণ প্যারামিলিটারি বাহিনী থেকে শক্তিশালী সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়। আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারেও এই বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ইরান পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন করবে কি না কিংবা আন্তর্জাতিক পরমাণু সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতা করবে কি না এমন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তেও তার মতামত ছিল চূড়ান্ত।
ইরান-ইরাক যুদ্ধ (১৯৮০–৮৮), যেখানে পশ্চিমা সমর্থন পেয়েছিল ইরাকের নেতা সাদ্দাম হোসেন, খামেনির রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে গভীর প্রভাব ফেলে। বিশ্লেষকদের মতে, এই অভিজ্ঞতা থেকেই যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের প্রতি তার অবিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়।
তার শাসনামলে ২০০৯ সালের বিতর্কিত নির্বাচন, ২০২২ সালের নারী অধিকার আন্দোলন এবং সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক বিক্ষোভসহ একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে সরকার। এসব আন্দোলন কঠোরভাবে দমন করা হয়, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমালোচনার জন্ম দেয়।
তিন দশকের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা খামেনি ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে নিরাপত্তাকেন্দ্রিক ও প্রতিরক্ষামুখী পথে পরিচালিত করেন। সমর্থকদের মতে, তিনি দেশকে বহিঃশত্রুর হুমকি থেকে রক্ষা করেছেন। সমালোচকদের মতে, তার নীতির কারণে আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা ও অর্থনৈতিক চাপ বেড়েছে।
তার মৃত্যু ইরানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
(এই ওয়েবসাইটের যেকোনো কিছু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি)
© 2026, এশিয়ান অনলাইন টিভি  |  সর্বস্বত্ব সংরক্ষিতDeveloped by Future IT
Recent comments
Latest Comments section by users
No comment available