অনলাইন ডেস্ক: ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনায় অগ্রগতি হলে ৫ আগস্ট বুধবারই হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে আলোচনা ব্যর্থ হলে ইরানকে ‘খুব কঠোরভাবে আঘাত’ করা হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
বিশ্বের তেল ও গ্যাস সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনায় অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে উঠেছে। এই জলপথে জাহাজ চলাচল নিয়ে বিরোধের জেরেই এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর আবারও সংঘাত শুরু হয়।
ইরান বর্তমানে হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করেছে। দেশটি এখন এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পাশাপাশি জাহাজ চলাচলের জন্য টোল আদায়ের দাবি করছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, যুদ্ধ শুরুর আগে অবশ্য এমন কোনো ক্ষমতা প্রয়োগ করেনি তেহরান।
৪ আগস্ট মঙ্গলবার ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে সমঝোতা হলে ‘আগামীকাল কিংবা পরদিনই’ হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া সম্ভব। ক্যালিফোর্নিয়ায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, আলোচনায় সংশ্লিষ্টরা সেদিন ‘খুব ভালো একটি দিন’ পার করেছেন।
তবে, এর আগে, ইরানকে আরও কড়া ভাষায় সতর্ক করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘খুব শিগগিরই প্রণালিটি খুলে দেওয়া হবে। তা না হলে ইরানকে খুব কঠোরভাবে আঘাত করা হবে। এরপর প্রণালি খুলে দেওয়া হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘একমাত্র পথ হলো লড়াই করে বেরিয়ে এসে ডিল করা।’
এদিকে বুধবার কিংবা বৃহস্পতিবারের মধ্যে সমঝোতা হতে পারে বলে জানিয়েছেন মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। সিএনবিসিকে তিনি বলেন, ‘আমরা একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে পারি, এমন সম্ভাবনা প্রবল।’
তবে, পরিস্থিতি যে এখনও অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ, তারই ইঙ্গিত মিলেছে মঙ্গলবারের দুটি ঘটনায়। হরমুজ প্রণালিতে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে কোনো একটি প্রজেক্টাইল আঘাত হানার পর এর এক নাবিক নিখোঁজ রয়েছেন। একই দিনে লোহিত সাগরে অজ্ঞাত হামলার পর একটি ভারতীয় জাহাজ ডুবে যায়।
ইরানকে নিয়ে ট্রাম্পের এমন কঠোর হুঁশিয়ারি অবশ্য নতুন নয়। গত সপ্তাহেও তিনি তেহরানকে ‘খুব কঠোরভাবে’ আঘাত করার হুমকি দিয়েছিলেন। এমনকি বেসামরিক অবকাঠামোতেও হামলা চালানোর ইঙ্গিত দিয়েছিলেন তিনি। তবে পরে সেই অবস্থান থেকে সরে এসে জানান, একটি সমঝোতা কাছাকাছি চলে এসেছে।
অন্যদিকে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো আলোচনা 'চলছে না' বলে বারবার দাবি করেছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। যদিও ট্রাম্প বরাবরই বলে আসছেন, দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে।
মঙ্গলবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাড়ানোর বিষয়ে ওমান ও ইরানের মধ্যে যে আলোচনা চলছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্রও সম্পৃক্ত রয়েছে।
এদিন মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও ওমান একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছেছে। বুধবারই এই সমঝোতার ঘোষণা দিতে চায় ওয়াশিংটন।
আঞ্চলিক কয়েকজন কর্মকর্তা ও এক মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে অ্যাক্সিওস জানায়, প্রস্তাবিত চুক্তিটি ৬০ দিনের জন্য কার্যকর হতে পারে। এর আওতায় ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী হরমুজ প্রণালিতে জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার ব্যবস্থা থাকবে।
হরমুজ ইস্যুতে কূটনৈতিক তৎপরতায় মধ্যস্থতা করছে কাতার। দেশটি জানিয়েছে, উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তবে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি কোনো আলোচনা হওয়ার পরিকল্পনা নেই।
মঙ্গলবার কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানির সঙ্গে ফোনে কথা বলেন ট্রাম্প। কাতারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, দুই নেতা ‘উত্তেজনা প্রশমনের প্রচেষ্টা’ নিয়ে আলোচনা করেছেন।
এর আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, মঙ্গলবারের মধ্যেই আলোচনার অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি ‘যেকোনো একটি সিদ্ধান্তে’ পৌঁছাতে পারবেন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছিলেন, বিষয়টি ‘খুব জটিল নয়’।
ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ করা। তবে ইরানের পরমাণু নিরস্ত্রীকরণে কিছুটা সময় লাগতে পারে বলেও স্বীকার করেছেন ট্রাম্প।
ইরান আলোচনায় বসার কথা অস্বীকার করায় এর আগে তেহরানকে ‘দ্বিমুখী’ আখ্যা দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। একই সঙ্গে তিনি বলেছিলেন, কোনো ‘সমঝোতা’ অথবা ‘সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ’ না হওয়া পর্যন্ত ইরানের বন্দরগুলোর বিরুদ্ধে মার্কিন পাল্টা অবরোধ বহাল থাকবে।
ইতোমধ্যে যুদ্ধের পাঁচ মাসেরও বেশি সময় পার হয়েছে। এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার। তারপরও ইরান এখনো মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর সক্ষমতা ধরে রেখেছে। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক জাহাজও হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে।
মঙ্গলবার ভোরে ব্রিটেনের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও জানায়, ওমান উপকূলের কাছে হরমুজ প্রণালিতে একটি অজ্ঞাত কার্গো জাহাজে ‘অজ্ঞাত প্রজেক্টাইল’ আঘাত হেনেছে।
এদিকে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কার্যত অবরোধ অব্যাহত রয়েছে। তেহরান বলছে, এই জলপথ দিয়ে চলাচলের আগে জাহাজগুলোকে ইরানের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক বাণিজ্যে লোহিত সাগরের নৌপথের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। তবে এই পথও এখন নিরাপদ নয়। ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে লোহিত সাগরে সামুদ্রিক অবরোধ ঘোষণা করেছে।
তবে সৌদি আরবের লোহিত সাগর তীরবর্তী ইয়ানবু বন্দর ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহ অব্যাহত রাখা সম্ভব হচ্ছে।
হুতিরা অবরোধ ঘোষণার পর থেকে একাধিক জাহাজে হামলার দাবি করেছে। তাদের অভিযোগ, এসব জাহাজ অবরোধ অমান্য করে চলাচল করছিল।
এছাড়াও মঙ্গলবার ইয়েমেন উপকূলের কাছে লোহিত সাগরে ভারতীয় জাহাজ এমএসভি ফাইজ নূর-ই-ওলিয়া অজ্ঞাত হামলার পর ডুবে যায়। তবে জাহাজটির সব নাবিককে উদ্ধার করা হয়েছে।
সূত্র: সিএনবিসি, ফক্স নিউজ
(এই ওয়েবসাইটের যেকোনো কিছু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি)
© 2026, এশিয়ান অনলাইন টিভি  |  সর্বস্বত্ব সংরক্ষিতDeveloped by Future IT
Recent comments
Latest Comments section by users
No comment available