রাঙামাটি প্রতিনিধি: রাঙামাটির দুর্গম পাহাড়ি জনপদে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, শিক্ষার প্রসার, চিকিৎসাসেবা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সহযোগিতা, খেলাধুলার পরিবেশ সৃষ্টি ও পরিবেশ সংরক্ষণে বহুমুখী জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৬ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়ন (২৬ ইসিবি)। দুর্গম পাহাড়ি পথ, প্রতিকূল আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছে সেনাবাহিনীর এই প্রকৌশল ইউনিট।
বিশেষ করে রাঙামাটির রাজস্থলী, বিলাইছড়ি ও আশপাশের দুর্গম এলাকায় সীমান্ত সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ধর্মীয় ও সামাজিক উন্নয়নে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের অধীন ২৬ ইসিবি ২০১৬ সালে রাজস্থলী প্রকল্প ক্যাম্প স্থাপনের মাধ্যমে এ অঞ্চলে অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু করে। পরে ২০১৯ সালের ৩ জুলাই সীমান্ত সড়ক (রাজস্থলী-দুমদুমিয়া-ফারুয়া-বিলাইছড়ি-সাইচল-বড়খলি-থেগামুখ) নির্মাণ প্রকল্পের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।
প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে ৭৬ কিলোমিটার ফ্লেক্সিবল পেভমেন্টের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে বগাখালী থেকে করল্লাছড়ি পর্যন্ত ২৮ কিলোমিটার সড়কের নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। পাশাপাশি তৃতীয় পর্যায়ে করল্লাছড়ি থেকে যেসামুখ পর্যন্ত ২৬ কিলোমিটার এবং অদয়াবাব থেকে থালিপাড়া পর্যন্ত ২২ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব সড়কের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সেতু, কালভার্ট, ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সড়ক যোগাযোগ সম্প্রসারিত হলে দুর্গম এলাকার মানুষের যাতায়াত সহজ হওয়ার পাশাপাশি কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ, জরুরি চিকিৎসাসেবা গ্রহণ ও স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডেও ভূমিকা রাখছে ২৬ ইসিবি। প্রাপ্ত তথ্যমতে, দুর্গম এলাকায় তিনটি যাত্রী ছাউনি, চারটি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং বিভিন্ন স্থানে নয়টি পানির পয়েন্ট স্থাপন করা হয়েছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও সবুজায়নের লক্ষ্যে রোপণ করা হয়েছে ৭০ হাজার ৬৮০টি ফলজ ও বনজ গাছের চারা।
শিক্ষার প্রসারে থুমপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্কুল ইউনিফর্ম ও শিক্ষা উপকরণ বিতরণের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের পাঠদান কার্যক্রম সচল রাখতে দুইজন শিক্ষকের বেতন-ভাতার দায়িত্ব নিয়েছে ২৬ ইসিবি। অন্যদিকে, বগাখালী নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপন ও চারটি বৈদ্যুতিক ফ্যানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিদ্যালয়ের মাঠ তৈরি, শিক্ষার্থীদের জার্সি ও ক্রীড়া সামগ্রী বিতরণের মাধ্যমে খেলাধুলার পরিবেশ তৈরিতেও সহযোগিতা করা হয়েছে।
থুমপাড়া এলাকায় শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার সুযোগ তৈরিতে নির্মাণ করা হয়েছে একটি খেলার মাঠ। আগে মাঠ না থাকায় স্থানীয় শিশুরা নিয়মিত খেলাধুলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল।
মানবিক সহায়তার অংশ হিসেবে থুমপাড়ার এক ক্যানসার আক্রান্ত রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নেওয়ার ব্যবস্থা করে ২৬ ইসিবি। একই সঙ্গে তাঁর চিকিৎসার যাবতীয় ব্যয়ভারও বহন করা হয়। বর্তমানে ওই রোগী সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এ ছাড়া গত ২ নভেম্বর বিলাইছড়ি উপজেলার সাইচল প্রকল্প ক্যাম্পসংলগ্ন গাছবাগান পাড়ার একটি বৌদ্ধ বিহার সংস্কার ও উন্নয়নকাজের জন্য আট বান ঢেউটিন অনুদান দিয়েছে ২৬ ইসিবি। দুর্গম এলাকার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানটির উন্নয়নে এ সহযোগিতাকে স্থানীয়রা সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন।
সীমান্ত সড়ক নির্মাণের ফলে স্থানীয় কৃষকদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণেও পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আগে যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে পাহাড়ে উৎপাদিত কলা, হলুদ, আদা ও অন্যান্য কৃষিপণ্য স্থানীয় বাজারে কম দামে বিক্রি করতে হতো। বর্তমানে রাঙামাটি, রাঙ্গুনিয়া ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন বাজারে এসব পণ্য সরবরাহের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
থুমপাড়া এলাকার একজন কার্বারি বলেন, ‘আগে আমাদের এলাকার মানুষের রাজস্থলী, চন্দ্রঘোনা কিংবা চট্টগ্রামে যাতায়াত করা অনেক কঠিন ছিল। যোগাযোগব্যবস্থা ভালো না থাকায় নানা সমস্যায় পড়তে হতো। এখন সেনাবাহিনীর সীমান্ত সড়ক নির্মাণের ফলে যাতায়াতের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। পাহাড়ে উৎপাদিত কলা, হলুদ, আদাসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য রাঙামাটি ও রাঙ্গুনিয়ার বাজারে সরবরাহ করতে পারছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষা, চিকিৎসা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও খেলাধুলার ক্ষেত্রেও ২৬ ইসিবি সহযোগিতা করছে। ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা এবং বৌদ্ধ বিহার সংস্কারে সহায়তা স্থানীয় মানুষের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’
বগাখালী নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানায়, আগে বিদ্যুতের অভাবে গরমের সময় শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করতে কষ্ট হতো। খেলার মাঠ ও ক্রীড়া সামগ্রীর অভাবেও তারা নিয়মিত খেলাধুলার সুযোগ পেত না। সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় সৌরবিদ্যুৎ, ফ্যান, খেলার মাঠ, জার্সি ও ক্রীড়া সামগ্রী পাওয়ায় তাদের পড়াশোনা ও খেলাধুলার পরিবেশ উন্নত হয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম জনপদে যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম প্রতিবন্ধকতা। এমন বাস্তবতায় সীমান্ত সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি শিক্ষা, চিকিৎসা, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, খেলাধুলা ও পরিবেশ সংরক্ষণে ২৬ ইসিবির উদ্যোগ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এসব উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে দুর্গম পাহাড়ি জনপদে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রসার ঘটবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে পারস্পরিক আস্থা, সম্প্রীতি ও সহযোগিতার সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে।
এটিভি/ এইচকে
(এই ওয়েবসাইটের যেকোনো কিছু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি)
© 2026, এশিয়ান অনলাইন টিভি  |  সর্বস্বত্ব সংরক্ষিতDeveloped by Future IT
Recent comments
Latest Comments section by users
No comment available