ক্যাম্পাস ডেস্ক: চার বছর আগে মৃত্যুর দুয়ার থেকে সন্তানকে ফিরিয়ে আনতে নিজের একটি কিডনি দিয়েছিলেন মা। সন্তানের বেঁচে থাকার আশায় নিজের শরীরের অঙ্গটুকুও দিতে দ্বিতীয়বার ভাবেননি তিনি। সেই কিডনি প্রতিস্থাপনের পর নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখেছিলেন ২৪ বছরের তরুণ জাহিদ হাসান। শুধু স্বপ্ন দেখেই থেমে থাকেননি, ঘুরে দাঁড়িয়ে শুরু করেছিলেন কর্মজীবনও। এনটিআরসিএর সুপারিশে একটি মাদ্রাসায় সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন তিনি।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। মায়ের দেওয়া কিডনিটিও বিকল হয়ে যাওয়ায় শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ১৮ আগস্ট মঙ্গলবার মারা গেছেন জাহিদ হাসান।
জাহিদের মৃত্যুতে স্বজনদের মধ্যে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। যে মা সন্তানকে বাঁচাতে নিজের কিডনি দিয়েছিলেন, সেই মায়ের চোখের সামনেই শেষ হয়ে গেল সন্তানের জীবন।
মৃত্যুর আগের দিন সোমবার নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি আবেগঘন পোস্ট দেন জাহিদ। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, ‘কাল সকাল ৭টায় উন্নত চিকিৎসা করতে ঢাকায় যাব। যদি ওই পর্যন্ত টিকে থাকি। আমি নিঃস্ব, কাঙাল। যা পারেন তাই দিয়ে হেল্প করেন। ভুল ত্রুটিগুলো ক্ষমা চেয়ে নিলাম। আমি অন্তিম মুহূর্তে এখন। হতে পারে শেষ কথাই।’
জাহিদের একটি ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেছিলেন, “আর পারতেছি না। মৃত্যুও আসে না। সর্ব শরীর কি যে অসহ্য ব্যাথা, বলতে পারছি না। ২৪ ঘণ্টা এই ব্যথা নিয়ে মরছি। চিকিৎসা করতে পারছি না অভাবে।”
ওই পোস্টে তিনি চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহযোগিতা কামনা করে আরও লিখেছিলেন, “আপনাদের সামান্য সহযোগিতাও আমার চিকিৎসার জন্য অনেক বড় সহায়তা হতে পারে।” পাশাপাশি পোস্টটি শেয়ার করে অন্যদের সহযোগিতার সুযোগ করে দেওয়ারও অনুরোধ জানিয়েছিলেন তিনি।
জাহিদের এই পোস্ট ছড়িয়ে পড়ার পর স্বজন, বন্ধু ও পরিচিতদের মধ্যে উৎকণ্ঠা তৈরি হয়। চিকিৎসার জন্য সহায়তার আবেদনও জানান তিনি। কিন্তু ঢাকায় গিয়ে উন্নত চিকিৎসা নেওয়ার আগেই না ফেরার দেশে চলে গেলেন তিনি।
জাহিদ হাসানের বাড়ি পঞ্চগড় সদর উপজেলার ঠেকরপাড়া গ্রামে। তিনি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক পাস করেছিলেন।
২০২২ সালের ২২ জানুয়ারি ঢাকার শ্যামলীর সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি (সিকেডি) হাসপাতালে জাহিদের শরীরে তার মা বুলি বেগমের একটি কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়। অস্ত্রোপচারের পর মা ও ছেলে দুজনেই শঙ্কামুক্ত ছিলেন বলে তখন পরিবার জানিয়েছিল।
এর আগে ২০২১ সালের ১৭ অক্টোবর পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেন, জাহিদের দুটি কিডনিই কাজ করছে না। রংপুর ও ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর তাকে সিকেডি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা কিডনি প্রতিস্থাপনের পরামর্শ দিলে সন্তানকে বাঁচাতে নিজের কিডনি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন মা বুলি বেগম।
তখন জাহিদের বড় বোন নূরনাহার বলেছিলেন, ‘ভেবেছিলাম ভাইকে বাঁচানো যাবে না। এখন আমি ভাইকে স্পর্শ করতে পারছি। ভাই চোখের সামনে সুস্থ জীবনের পথে হাঁটছে- এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না।’
নিজের মায়ের দেওয়া কিডনি পেয়ে নতুন জীবন পাওয়ার অনুভূতিও জানিয়েছিলেন জাহিদ। বলেছিলেন, ‘ভালো আছি, নতুন করে জন্ম নিলাম পৃথিবীর বুকে। জগতজুড়ে একটাই মধুর নাম মা। কথাটি আজ বুঝতে পারছি।’
কিন্তু সেই নতুন জীবন দীর্ঘস্থায়ী হলো না। মায়ের দেওয়া কিডনিও পরে বিকল হয়ে যায়। ধীরে ধীরে জাহিদের শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কাছে হার মানতে হলো তাকে।
জাহিদের পরিবার আগে থেকেই নানা সংকটের মধ্য দিয়ে আসছিল। ২০০৪ সালে ব্লাড ক্যানসারে মারা যান তার ছোট বোন। একই বছর বাসচালক বাবাকেও হারান তিনি। এরপর অভাব-অনটনের মধ্যেই বড় হয়েছেন জাহিদ ও তার ভাই-বোনেরা।
জাহিদকে বাঁচাতে চিকিৎসার খরচ জোগাতে পরিবারের ৩০ শতাংশ জমিসহ পৈতৃক ভিটাও বিক্রি করতে হয়েছিল। সবকিছু হারিয়েও তখন পরিবারের একটাই আশা ছিল, জাহিদ বেঁচে থাকবেন।
কিন্তু সেই আশা আর পূরণ হলো না। মায়ের দেওয়া কিডনি নিয়ে যে সন্তান নতুন করে জীবন শুরু করেছিলেন, চার বছর পর সেই জাহিদই চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
স্থানীয় জুলফিকার আলী জনি বলেন, ‘জাহিদ খুব ভালো ছেলে ছিল। অসুস্থ হওয়ার পর তার মা নিজের কিডনি দিয়ে ছেলেকে বাঁচিয়েছিলেন। পরে সে সুস্থ হয়ে চাকরিতে যোগ দিয়েছিল। তার এমন মৃত্যু আমরা কেউ মেনে নিতে পারছি না।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মাহাতাব প্রধান মারিফ বলেন, ‘জাহিদকে আমরা ছোটবেলা থেকেই দেখেছি। অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা করেছে। মায়ের কিডনি পেয়ে যখন সুস্থ হয়ে শিক্ষকতার চাকরি করছিল, তখন আমরা সবাই খুশি হয়েছিলাম। আবার অসুস্থ হয়ে এত অল্প সময়ে সে মারা যাবে, এটা কখনো ভাবিনি।’
(এই ওয়েবসাইটের যেকোনো কিছু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি)
© 2026, এশিয়ান অনলাইন টিভি  |  সর্বস্বত্ব সংরক্ষিতDeveloped by Future IT
Recent comments
Latest Comments section by users
No comment available