রাঙামাটি প্রতিনিধি: প্রশাসন ও বন বিভাগের নজর এড়িয়ে কাপ্তাই হ্রদ দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে মূল্যবান সেগুনসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ কেটে পাচারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। দুর্গম বনাঞ্চলে পর্যাপ্ত জনবল সংকট, দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা এবং স্থানীয় প্রভাবশালী সশস্ত্র আঞ্চলিকদলগুলোর নানান চাপের কারণে অনেক এলাকায় নিয়মিত তদারকি সম্ভব হয় না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। এর সুযোগ নিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সংরক্ষিত বন থেকে মূল্যবান সেগুন গাছ কেটে তা বিভিন্ন পথে পাচার করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে এমনই একটি চালান রাঙামাটিতে প্রবেশের সময় অভিযান চালিয়ে চারটি বোট ভর্তি বিপুল পরিমাণ সেগুন কাঠ জব্দ করেছে রাঙামাটির দক্ষিণ বন বিভাগ। বন বিভাগের দাবি, জব্দ করা কাঠের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৩ হাজার ঘনফুট।
বন বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার বিকেলে রাঙামাটি-কাপ্তাই নৌপথের ঝগড়াবিল এলাকায় সন্দেহজনকভাবে কয়েকটি কাঠবোঝাই বোটের অবস্থানের খবর পায় বন বিভাগ। পরে রাঙামাটি দক্ষিণ বন বিভাগের সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা খন্দকার মাহমুদুল হক মুরাদের নেতৃত্বে বন বিভাগের একটি দল সেখানে অভিযান চালায়।
অভিযানকালে রাঙামাটির দিকে আসা চারটি বোট আটক করা হয়। এ সময় বন বিভাগের সদস্যদের উপস্থিতি টের পেয়ে বোটে থাকা কয়েকজন ব্যক্তি নদীতে ঝাঁপ দিয়ে পালিয়ে যান বলে জানিয়েছে বন বিভাগ। পরে কাঠবোঝাই বোটগুলো জব্দ করে বন বিভাগের হেফাজতে নেওয়া হয়।
৫ সেপ্টেম্বর শনিবার সকাল থেকে জব্দ করা সেগুন প্রজাতির গোল কাঠগুলো বোট থেকে নামিয়ে বন বিভাগের কার্যালয়ে নেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়।
রাঙামাটি দক্ষিণ বন বিভাগের সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা খন্দকার মাহমুদুল হক মুরাদ বলেন, সেগুন কাঠ ভর্তি কয়েকটি বোট কাপ্তাই হ্রদ দিয়ে রাঙামাটিতে প্রবেশ করবে এমন তথ্য পান আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ডিএফও এসএম সাজ্জাদ হোসেন। স্থানীয় সোর্সের মাধ্যমে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কাঠবোঝাই বোট রাঙামাটিতে প্রবেশের তথ্য পাওয়া যায়। পরে শুক্রবার বিকেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় সদর রেঞ্জের সদস্যরা কাপ্তাই হ্রদের ঝগড়াবিল এলাকায় নৌ-পথে অভিযান চালিয়ে সেগুলো জব্দ করা হয়।
তিনি জানান, চারটি বোটে আনুমানিক সাড়ে ৩ হাজার ঘনফুট সেগুন কাঠ রয়েছে। জব্দ করা কাঠের বিষয়ে সিজার লিস্ট প্রস্তুত করে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। কাঠের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় কোটি টাকা বলে জানা গেছে।
স্থানীয় কাঠ ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভালো মানের সেগুন কাঠের বাজারমূল্য প্রতি ঘনফুট প্রায় ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
জব্দ করা চারটি বোটের কাঠের মালিকানা ও কাঠের উৎস এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি বন বিভাগ। কাঠগুলোর উৎস কোথায় এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত; তা তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাঙামাটি দক্ষিণ বন বিভাগের সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা খন্দকার মাহমুদুল হক মুরাদ এশিয়ান টিভিকে জানান, জব্দ করা কাঠের সিজার লিস্ট প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং এ ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। তদন্তের পর কাঠের মালিকানা ও পাচারের সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে।
এদিকে স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি প্রভাবশালী পাহাড়ি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে রাঙামাটির কিছু কাঠ ব্যবসায়ীকে চলতি মাসের ৪ সেপ্টেম্বরের মধ্যে কাঠ সংগ্রহ করে নেওয়ার জন্য সময়সীমা বেধে দেওয়া হয়েছিল। এরপর আর কাঠ সংগ্রহ বা পরিবহনের সুযোগ থাকবে না; এমন বার্তা দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি সূত্রগুলোর।
স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, ওই সময়সীমাকে কেন্দ্র করে একটি চক্র দ্রুতগতিতে বিভিন্ন দুর্গম এলাকা থেকে কাঠ সংগ্রহ করে রাঙামাটির বিভিন্ন করাতকল ও গোপন মজুত স্থলে নেওয়ার চেষ্টা করে। এরই অংশ হিসেবে জব্দ হওয়া কাঠগুলো বিলাইছড়ি এলাকা থেকে রাঙামাটির দিকে আনা হচ্ছিল বলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে।
বন বিভাগের অভিযানে মাঝেমধ্যে বিপুল পরিমাণ অবৈধ কাঠ জব্দ হলেও এসব চালানের নেপথ্যে থাকা মূল হোতারা অনেক সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি বনাঞ্চল থেকে গাছ কাটার পর তা নদীপথে বিভিন্ন রুট ব্যবহার করে রাঙামাটি শহর ও আশপাশের এলাকায় পৌঁছে দেওয়ার একটি নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গাছ কাটার জন্য প্রথমে দুর্গম সংরক্ষিত বনাঞ্চল বেছে নেওয়া হয়। পরে শ্রমিকদের মাধ্যমে গাছ কেটে সেগুলো ছোট-বড় আকারে প্রস্তুত করে নদীপথে নামানো হয়। এরপর রাতের আঁধার বা বন বিভাগের নজরদারি কম থাকার সুযোগে বোটে করে কাঠ পরিবহন করা হয়। কোথাও কোথাও স্থানীয় প্রভাবশালী মহল বা সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে এই কাঠ পরিবহন করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বন বিভাগের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুর্গম সংরক্ষিত বনাঞ্চলে পর্যাপ্ত জনবল ও প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সহায়তার ঘাটতি থাকায় প্রতিটি এলাকায় নিয়মিত নজরদারি চালানো কঠিন। ফলে সংঘবদ্ধ কাঠ পাচারকারীরা অনেক সময় বন বিভাগের চোখ এড়িয়ে গাছ কাটার সুযোগ পেয়ে যায়।
পরিবেশবাদী ও স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, সংরক্ষিত বন থেকে অবৈধভাবে গাছ কাটা শুধু সরকারি সম্পদের ক্ষতি নয়, পাহাড়ের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্যও মারাত্মক হুমকি। বড় ও পুরোনো সেগুনসহ অন্যান্য মূল্যবান গাছ একবার কেটে ফেললে সেই বনভূমির স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন। তাদের দাবি, বিচ্ছিন্নভাবে কাঠ জব্দের পাশাপাশি এই চোরাচালান নেটওয়ার্কের মূল উৎস, গাছ কাটার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি, পরিবহনকারী, মজুতদার এবং অবৈধ কাঠের ক্রেতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে দুর্গম সংরক্ষিত বনাঞ্চলে বন বিভাগের জনবল ও নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।
(এই ওয়েবসাইটের যেকোনো কিছু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি)
© 2026, এশিয়ান অনলাইন টিভি  |  সর্বস্বত্ব সংরক্ষিতDeveloped by Future IT
Recent comments
Latest Comments section by users
No comment available