মাদকাসক্তদের পক্ষে আদালতে আইনজীবিদের না দাঁড়ানোর আহ্বান দীপেন দেওয়ানের
রাঙামাটি প্রতিনিধি: মাদকাসক্ত ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে আইনজীবীদের আরও কঠোর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন রাঙামাটি-২৯৯ আসনের সংসদ সদস্য ও আইনজীবী অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান। মাদকাসক্তদের পক্ষে আদালতে আইনজীবীরা যাতে না দাঁড়ান, সে আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।২৪ আগস্ট সোমবার সকালে রাঙামাটি জেলা পুলিশের আয়োজনে ‘মাদককে প্রতিরোধ করি, যুব সমাজকে রক্ষা করি’ প্রতিপাদ্যে অনুষ্ঠিত মাদকবিরোধী বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা ও সুধী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান।দীপেন দেওয়ান বলেন, “মাদক আমাদের সমাজের একটি মরণব্যাধীতে পরিণত হয়েছে। এই মরণব্যাধি থেকে সমাজকে মুক্ত করতে হলে শুধু আইন প্রয়োগ করলেই হবে না; প্রয়োজন সম্মিলিত সামাজিক প্রতিরোধ।”নিজের পেশাগত পরিচয়ের প্রসঙ্গ তুলে তিনি সহকর্মী আইনজীবীদের উদ্দেশে বলেন, মাদকাসক্ত ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে সামাজিক অবস্থান আরও শক্ত করতে হবে। মাদকসংক্রান্ত অপরাধে জড়িতদের পক্ষে আইনজীবীরা দাঁড়ানো থেকে বিরত থাকলে তাদের ওপর সামাজিক ও আইনগত চাপ আরও বাড়বে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।তিনি বলেন, “আইনজীবীরা যদি মাদকাসক্তদের পক্ষে না দাঁড়ান, তাহলে তাদের রাঙামাটি থেকে চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আদালতে আদালতে ঘুরতে হবে। একসময় তারা এই হয়রানিমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বেরিয়ে মাদক ব্যবসা কিংবা মাদকের সংশ্রব ত্যাগ করতে বাধ্য হবে।”দীপেন দেওয়ান আরও বলেন, মাদকের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি যে রাজনৈতিক দলেরই হোক না কেন, তাকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক প্রভাব কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে কোনো মাদক কারবারিকে রক্ষা করার চেষ্টা করা হলে মাদক নির্মূলের উদ্যোগ ব্যাহত হবে।তিনি বলেন, “মাদক নির্মূলে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আমরা সবাই চেষ্টা করলে এবং স্থানীয় জনগণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করলে আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যেই রাঙামাটি শহরকে মাদকমুক্ত শহর হিসেবে ঘোষণা করা সম্ভব।”মাদক কারবারিদের সঙ্গে সামাজিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার আহ্বান জানিয়ে সংসদ সদস্য বলেন, সমাজের প্রতিটি স্তর থেকে মাদককে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সংগঠন, জনপ্রতিনিধি, আইনজীবী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী—সবাইকে নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে।তিনি বলেন, মাদক শুধু একজন ব্যক্তির জীবন ধ্বংস করে না; একটি পরিবার, একটি প্রজন্ম এবং পুরো সমাজকে বিপর্যস্ত করে। বিশেষ করে তরুণ সমাজকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে এখনই কার্যকর সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।সমাবেশের প্রধান আলোচক চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী বলেন, মাদক ব্যবসায়ী, বিক্রেতা, ডিলার, গডফাদার, অর্থের জোগানদাতা ও মাদকসেবীদের আশ্রয়দাতাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, “মাদকবিরোধী অভিযান আরও শক্তিশালী ও জোরালো করা হবে। জিরো টলারেন্স নীতিতে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চলবে। এ ক্ষেত্রে এক চুল পরিমাণও ছাড় দেওয়া হবে না।”ডিআইজি বলেন, শুধু পুলিশের একার পক্ষে মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয়। পুলিশের লোকবলের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই মাদক কারবারিদের বিষয়ে তথ্য দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করতে হবে এবং একই সঙ্গে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। মাদকবিরোধী অভিযানে পুলিশের কোনো সদস্য গাফিলতি করলে তার বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি। কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেবে বলেও জানান ডিআইজি।সমাবেশে কমিউনিটি পুলিশ রাঙামাটির সভাপতি, রাঙামাটি চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সরকারি কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট মামুনুর রশিদ মামুন বলেন, মাদকের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে বর্জন করতে হবে। তিনি শিক্ষার্থী, তরুণ ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মাদকের বিরুদ্ধে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান। দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে কেউ মাদক কারবারে জড়িত থাকলে তাকেও আইনের আওতায় আনার পক্ষে কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেন তিনি।এর আগে সকালে শহরের মিনিস্ট্রিয়াল ক্লাব থেকে ‘মাদককে প্রতিরোধ করি, যুব সমাজকে রক্ষা করি’ প্রতিপাদ্যে মাদকবিরোধী বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হয়। শোভাযাত্রাটি শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে শাহ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় অডিটোরিয়ামে গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানে অনুষ্ঠিত হয় মাদকবিরোধী সুধী সমাবেশ।রাঙামাটি পুলিশ সুপার মো. আব্দুর রকিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান। প্রধান আলোচক ছিলেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী। এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে রাঙামাটির অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নিশাত শারমিন, রাঙামাটি সদর জোনের জোন কমান্ডার লে. কর্নেল একরামুল রাহাত-পিএসসি, অ্যাডভোকেট মামুনুর রশিদ, মো. মুজিবুর রহমান। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে আরো বক্তব্য রাখেন রাঙামাটি ইমাম সমিতির সভাপতি মাওলানা এবিএম তোফায়েল, রাঙামাটি প্রেসক্লাবের সভাপতি আনোয়ার আল হক প্রমুখ।সমাবেশ থেকে মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন জোরদার এবং মাদক ব্যবসা ও সেবনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।