আন্তর্জাতিক ডেস্ক: দীর্ঘ দুই দশকের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ঐতিহাসিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে পৌঁছাতে যাচ্ছে ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। প্রায় ২০ বছর ধরে চলা আলোচনার পর অবশেষে এই চুক্তি চূড়ান্ত করতে যাচ্ছে উভয় পক্ষ। ২৭ জানুয়ারি মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তির ঘোষণা দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন ভারতীয় কর্মকর্তারা। বৈশ্বিক বাণিজ্যে অস্থিরতা, শুল্কযুদ্ধ আর ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই নয়াদিল্লি ও ব্রাসেলসের এই সমঝোতাকে দেখা হচ্ছে অর্থনৈতিক সম্পর্কের নতুন যুগের সূচনা হিসেবে।

সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড বলছে, ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন এবং ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকে বসবেন। সেই বৈঠকেই বহুল প্রতীক্ষিত এই চুক্তির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসবে। ভারতের বাণিজ্য সচিব রাজেশ আগরওয়াল সোমবার বলেন, ‘দুই পক্ষের সরকারি পর্যায়ের আলোচনা শেষ হয়েছে এবং শিগগিরই আলোচনার সফল সমাপ্তির ঘোষণা দেয়া হবে।’


তিনি চুক্তিটিকে ‘ভারসাম্যপূর্ণ ও ভবিষ্যতমুখী’ আখ্যা দিয়ে বলেন, এতে দুই অঞ্চলের অর্থনৈতিক সংযোগ আরও গভীর হবে এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়বে।
এদিকে ভারতীয় কর্মকর্তারা এই চুক্তিকে আখ্যা দিয়েছেন ‘সব চুক্তির জননী’ হিসেবে। মূলত এই চুক্তির ব্যাপ্তি ও কৌশলগত গুরুত্ব বোঝাতেই এটা বলেছেন তারা। বৈশ্বিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কহুমকি ও চীনের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের প্রেক্ষাপটে নয়াদিল্লি ও ব্রাসেলস বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৈচিত্র্যময় করতে এই চুক্তিকে বড় হাতিয়ার হিসেবে দেখছে।
এই সমঝোতার ফলে ভারত ও ২৭ দেশের ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে পণ্য বাণিজ্য আরও সহজ হবে। দুই পক্ষ মিলিয়ে বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় এক-চতুর্থাংশ প্রতিনিধিত্ব করে এবং প্রায় ২০০ কোটি ভোক্তার বিশাল বাজার রয়েছে।
ইইউর তথ্যমতে, ২০২৪ সালে দুই পক্ষের পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৩৯ বিলিয়ন ডলারে, যা এক দশক আগের তুলনায় প্রায় ৯০ শতাংশ বেশি। এর বাইরে সেবা খাতে বাণিজ্য হয়েছে আরও প্রায় ৬৯ বিলিয়ন ডলার। ভারতীয় হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চে শেষ হওয়া অর্থবছরে মোট দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৩৬.৫ বিলিয়ন ডলার।
চুক্তির আওতায় ইউরোপীয় গাড়ি ও মদের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের জন্য ভারতীয় বাজারে প্রবেশাধিকার সহজ করার কথা ভাবছে নয়াদিল্লি। একই সঙ্গে টেক্সটাইল ও ওষুধসহ ভারতীয় পণ্যের জন্য ইউরোপীয় বাজারে আরও ভালো প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে চায় ভারত।
সাম্প্রতিক আলোচনায় সবচেয়ে বেশি বিতর্ক হয়েছে গাড়ি ও ইস্পাত খাত নিয়ে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন চেয়েছে, ভারতে গাড়ির আমদানি শুল্ক বড় আকারে কমাতে, যা বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশেরও বেশি। অন্যদিকে বিশ্বের অন্যতম বড় ইস্পাত উৎপাদক ভারত ইউরোপের বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ শিথিল করার দাবি তুলেছে।
আগে জানানো হয়েছিল, এই চুক্তির অংশ হিসেবে ভারত ইউরোপীয় গাড়ির ওপর শুল্ক ১১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে প্রায় ৪০ শতাংশে নামাতে পারে। তবে কিছু সংবেদনশীল কৃষি ও দুগ্ধজাত পণ্য আলোচনার বাইরে রাখা হয়েছে। কোটি কোটি ক্ষুদ্র কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় এসব খাতে ছাড় দিতে রাজি হয়নি ভারত।
২০০৭ সালে প্রথম এই আলোচনা শুরু হলেও কয়েক বছর পর তা স্থবির হয়ে পড়ে। ২০২২ সালে নয় বছর বিরতির পর নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। গত বছর মোদি ও ফন ডার লিয়েন আলোচনায় গতি আনার সিদ্ধান্ত নেয়ার পর সমঝোতার পথ আরও প্রশস্ত হয়, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য উত্তেজনা বাড়ার প্রেক্ষাপটে।
মূলত এই চুক্তি এমন এক সময়ে আসছে, যখন দুই পক্ষই বৈশ্বিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় নতুন অংশীদার খুঁজছে। সম্প্রতি ইইউ দক্ষিণ আমেরিকার মেরকোসুর জোটের সঙ্গে বড় চুক্তি করেছে এবং ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো ও সুইজারল্যান্ডের সঙ্গেও সমঝোতা সম্পন্ন করেছে। অন্যদিকে ভারত চুক্তি করেছে ব্রিটেন, নিউজিল্যান্ড ও ওমানের সঙ্গে।
একজন ভারতীয় কর্মকর্তা জানান, আইনি যাচাই শেষে পাঁচ থেকে ছয় মাসের মধ্যে চুক্তির আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর হতে পারে এবং এক বছরের মধ্যেই এটি কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারত চলতি বছরই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাবে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হতে যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় ভারত-ইইউ চুক্তিকে উভয় পক্ষই ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য সমঝোতা হিসেবে দেখছে।
(এই ওয়েবসাইটের যেকোনো কিছু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি)
© 2026, এশিয়ান অনলাইন টিভি  |  সর্বস্বত্ব সংরক্ষিতDeveloped by Future IT
Recent comments
Latest Comments section by users
No comment available