• ঢাকা
  • |
  • সোমবার ৯ই ভাদ্র ১৪৩৩ বিকাল ০৪:২৬:৫৭ (24-Aug-2026)
  • - ৩৩° সে:

পিরোজপুরে বাঁশের ‘চাই’ শিল্পে কর্মসংস্থান, স্বাবলম্বী ১৫ হাজার নারী-পুরুষ

২৪ আগস্ট ২০২৬ বিকাল ০৩:১০:৪২

পিরোজপুরে বাঁশের ‘চাই’ শিল্পে কর্মসংস্থান, স্বাবলম্বী ১৫ হাজার নারী-পুরুষ

পিরোজপুর প্রতিনিধি: আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যেতে বসা গ্রামবাংলায় মুলি ও মোড়ল বাঁশ দিয়ে তৈরি ঐতিহ্যবাহী ‘চাই’ শত বছরের এই লোকজ ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন নেছারাবাদ উপজেলার কয়েকটি গ্রামের কারিগর ও নারীরা। আধুনিকতার দ্রুত পরিবর্তনের মধ্যেও গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা লোকজ ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন হয়ে টিকে আছে নেছারাবাদে ‘চাই’ শিল্প। মুলি ও মোড়ল বাঁশের সরু সলা, সুতা আর গ্রামীণ নারীদের নিপুণ হাতের বুননে তৈরি এই মাছ ধরার ফাঁদ শুধু একটি লোকজ উপকরণ নয়—এটি দক্ষিণাঞ্চলের জলজ সংস্কৃতি, পারিবারিক ঐতিহ্য ও হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শতবর্ষের এক শিল্পকর্ম।

তবে মাছ ধরা, প্রকৃতি ও জীবিকার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রাচীন জ্ঞানধারার কয়েকটি প্রামাণ্য ভাবার্থ ব্যবহার লাওৎসে বিশিষ্ট গ্রামীণ সংস্কৃতির জ্ঞান-বিদ উক্তি “প্রকৃতির নিয়মের সঙ্গে চলাই জ্ঞানের পথ।”

চাই দিয়ে মাছ ধরার মতো ঐতিহ্যবাহী জীবনযাপন প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সহাবস্থানের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
অ্যারিস্টটল তাঁর প্রকৃতি-বিষয়ক দর্শনের ভাবার্থ: প্রকৃতির প্রতিটি জীবের নিজস্ব উদ্দেশ্য ও ভূমিকা রয়েছে। নদী-খাল, মাছ ও মানুষের জীবন—সবই একটি প্রাকৃতিক ব্যবস্থার অংশ।

কনফুসিয়াস, তাঁর শিক্ষার ভাবার্থ: পুরোনো ঐতিহ্য ও অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যৎকে সমৃদ্ধ করতে হয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাঁশের চাই দিয়ে মাছ ধরার ঐতিহ্যের সঙ্গে এটি সুন্দরভাবে মেলে।
তবে এগুলোকে সরাসরি “মাছ শিকারের প্রাচীন উক্তি” হিসেবে উদ্ধৃত না করে “ভাবার্থ” হিসেবে ব্যবহার করাই সঠিক।

উপজেলার করফা, চীনা-বুনিয়া, বলদিয়া, জলাবাড়ি, মাহমুদকাটি, আটঘর-কুড়িয়ানা, কাটাখালি, কাঁটা-বুনিয়া, চিলতলাসহ অন্তত ১৮টি গ্রামের প্রায় ১৫ হাজার নারী-পুরুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে চাই তৈরি, বিক্রি ও এর মাধ্যমে মাছ শিকারের সঙ্গে যুক্ত। কেউ বাঁশ সংগ্রহ ও সলা তৈরির কাজ করেন, কেউ চাই বোনেন, আবার কেউ নৌকা-ট্রলার কিংবা স্থানীয় বাজারে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করেন। অনেক পরিবার নিজেরাই চাই তৈরি করে বর্ষাকালে খাল-বিল, নালা ও নিচু জমিতে পেতে দেশীয় মাছ শিকার করে সংসারের চাহিদা মেটায়ে মাছ বাজারেও বিক্রি করে।

বাঁশ থেকে তৈরি হয় ঐতিহ্যের এই ‘চাই’ স্থানীয় কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চাই তৈরির প্রধান উপকরণ মুলি ও মোড়ল বাঁশ এবং সুতা। প্রথমে বাঁশ প্রয়োজন মতো কেটে ছাঁচা হয়। বাঁশের টুকরোগুলো কয়েকদিন পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়। পরে রোদে শুকিয়ে সলা তৈরি করা হয়। সেই সরু ও নমনীয় সলা দিয়ে নির্দিষ্ট নকশায় কাঠামো তৈরি করে সুতা দিয়ে বুনে তৈরি করা হয় মাছ ধরার চাই।

স্থানীয়ভাবে মাছের ধরন ও আকার অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের চাই তৈরি হয়। ছোট দেশীয় মাছ ধরার জন্য মুলি বাঁশের চাই বেশি ব্যবহৃত হয়। আর তুলনামূলক বড় মাছ ধরার উপযোগী চাই তৈরিতে মোড়ল বাঁশ ব্যবহার করা হয়। বোয়াল, গজার, শোল, মাগুর, ট্যাংরা, কৈ, ভেদা, বাইন, টাকি, ফুটি ও বিভিন্ন প্রজাতির ছোট-বড় দেশীয় মাছ ধরতে আলাদা ধরনের চাই তৈরি করা হয়।

একেকটি চাই আকার ও মানভেদে প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। স্থানীয় হাট-বাজারের পাশাপাশি আটঘর-কুড়িয়ানা এলাকায় চাইয়ের কেনাবেচার আলাদা বাজারচিত্রও দেখা যায়। পুরুষরা অনেক সময় নৌকা বা ট্রলারযোগে বিভিন্ন বাজারে চাই নিয়ে যান। ফলে এই শিল্পকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে একটি ক্ষুদ্র গ্রামীণ অর্থনৈতিক বলয়।

নারীর হাতে বোনা, পুরুষের হাতে বাজারজাত চাই তৈরির সঙ্গে সবচেয়ে নিবিড়ভাবে যুক্ত গ্রামীণ নারীরা। পুরুষরা সাধারণত বাঁশ কাটা, সলা তৈরি ও কাঠামো প্রস্তুতের কাজ করেন। এরপর নারীরা সেই সলা দিয়ে ধৈর্য ও নিপুণতার সঙ্গে চাই বুনে শেষ করেন। পরিবারের পুরুষ সদস্যরা তৈরি করা চাই নৌকা, ট্রলার কিংবা ভ্যানযোগে স্থানীয় হাট-বাজারে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করেন।

বলদিয়ার আব্দুল গফুর আলী বলেন, বাপ-দাদার সময় থেকেই এলাকায় চাই তৈরির প্রচলন রয়েছে। বর্ষা এলে খাল-বিল ও নিচু জমিতে পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চাইয়ের ব্যবহারও বেড়ে যায়। মাছ ধরার পাশাপাশি চাই বিক্রি করেও বহু পরিবার নির্ভরশীল।

চিমতলার আব্দুর রহিম জানান, পানির স্রোত ও মাছের চলাচলের পথ বুঝে নির্দিষ্ট জায়গায় চাই পেতে রাখা হয়। বিশেষ করে বর্ষায় ফসলি জমি, খাল, বিল ও নালায় দেশীয় মাছ চলাচল করলে সেখানে চাই বসিয়ে মাছ ধরা হয়। ভোরে গিয়ে চাই উঠালে অনেক সময় কৈ, ট্যাংরা, শোল, মাগুর, বাইন, টাকি ও অন্যান্য দেশীয় মাছ পাওয়া যায়। এসব মাছ একদিকে পরিবারের খাবারের চাহিদা মেটায়, অন্যদিকে বাড়তি মাছ স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে আয় করা হয়।

চীনা-বুনিয়ার ফারুক হোসেন বলেন, চাই দিয়ে মাছ ধরা তুলনামূলক সহজ এবং এটি গ্রামবাংলার দীর্ঘদিনের পরিচিত পদ্ধতি। 

Recent comments

Latest Comments section by users

No comment available

সর্বশেষ সংবাদ