• ঢাকা
  • |
  • সোমবার ২৩শে ভাদ্র ১৪৩৩ রাত ০৯:৫২:২২ (07-Sep-2026)
  • - ৩৩° সে:

জাহাজ ভাঙা শিল্পে

এককালীন ক্ষতিপূরণ যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক পূর্ণাঙ্গ প্রতিকার

৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রাত ০৮:৪৭:২৪

এককালীন ক্ষতিপূরণ যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক পূর্ণাঙ্গ প্রতিকার

ডেস্ক রিপোর্ট: সকল প্রাণের নিরাপত্তা (সপ্রান) এবং অল ভিক্টিমস অ্যান্ড ভেটেরান্স নেটওয়ার্কের (এভিএন) যৌথ আয়োজনে “জাহাজ ভাঙার মানবিক মূল্য: বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্পে জবাবদিহি, প্রতিকার ও পুনরাবৃত্তি রোধ” শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

৭ সেপ্টেম্বর সোমবার বিকেল ৪টায় ঢাকার বাংলামোটরে অবস্থিত বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ৬০৫ নম্বর কক্ষে এ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

আলোচনাসভাটির উদ্দেশ্য ছিল এস এন করপোরেশনের জাহাজভাঙা কারখানায় এমটি সুবর্ণ স্বরাজ্য জাহাজে সংঘটিত বিস্ফোরণের দুই বছর পূর্তিতে বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্পে শ্রমিকের মৃত্যু, জবাবদিহির ঘাটতি এবং ক্ষতিপূরণ ও প্রতিকারের বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের জন্য ন্যায়বিচার ও কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করতে বিভিন্ন অংশীজনের ভূমিকা ও দায়বদ্ধতা এবং বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরা হয়।

আলোচনায় ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য, মানবাধিকারকর্মী, গবেষক, আইনজীবী, পরিবেশকর্মী, সাংবাদিক, সংসদ সদস্য এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।

আলোচনার শুরুতে সপ্রানের গবেষক অপসরা ইসলাম তন্দ্রা তাঁর উপস্থাপনায় জাহাজভাঙা শিল্পে শ্রমিকের মৃত্যু, দুর্ঘটনার কারণ, কর্মক্ষেত্রজনিত আঘাত এবং দুর্ঘটনার পর ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের প্রতিকার পাওয়ার সংকট তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এককালীন ক্ষতিপূরণ যথেষ্ট নয়; কার্যকর প্রতিকারের জন্য পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ, চিকিৎসা ও মানসিক পুনর্বাসন, সত্য উদ্‌ঘাটন এবং পুনরাবৃত্তি রোধের ব্যবস্থা প্রয়োজন।

নিহত শ্রমিকদের পরিবারের সদস্যরা তাঁদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা ও ন্যায়বিচারের দাবি জানান। নিহত হাবিবের স্ত্রী সাবিনা খাতুন বলেন, স্বামীর মৃত্যুর পর পাওয়া অর্থ দিয়ে পরিবারের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তিনি প্রশ্ন করেন, “একজন মানুষ মারা গেলে তাঁর জীবনের মূল্য কি মাত্র ৭ লাখ টাকা?”

নিহত বরকতের শাশুড়ি রোকেয়া বেগম বলেন, এককালীন অর্থের পরিবর্তে সন্তানদের জন্য নিয়মিত মাসিক সহায়তার ব্যবস্থা প্রয়োজন। নিহত জাহাঙ্গীরের স্ত্রী শারমিন বেগম সন্তানদের শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ পরিবারের জন্য নিয়মিত সহায়তার দাবি জানান। নিহত খায়রুলের বাবা কামাল শেখ তাঁর একমাত্র সন্তানের মৃত্যুর ঘটনায় বিচার ও জবাবদিহি দাবি করেন।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, আইন ও প্রতিষ্ঠান থাকলেও সেগুলোর কার্যকর প্রয়োগ ও পারস্পরিক সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। এসব দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিশন গঠিত হলেও তদন্ত প্রতিবেদনগুলো কখনো জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয় না বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি দুর্ঘটনার পর ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) সহকারী পরিচালক মো. তৈয়্যেবুর রহমান বলেন, ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু একটি নির্দিষ্ট অঙ্ক নয়; শ্রমিকের আয়, বয়স, তাঁর ওপর পরিবারের নির্ভরশীলতা এবং ক্ষতির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। তিনি কর্মক্ষেত্রজনিত দুর্ঘটনা ও আঘাতের ক্ষতিপূরণ কর্মসূচি, দ্রুত বিচার, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি এবং সহজলভ্য আইনি সহায়তার ওপর গুরুত্ব দেন।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের (ওএইচসিএইচআর) সহকারী মানবাধিকার কর্মকর্তা সায়মা করিম শ্যানন বলেন, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো দুর্ঘটনা নয়; বরং এগুলো কাঠামোগত সমস্যার প্রতিফলন। তিনি জাহাজভাঙা শিল্পের মালিকানা ও দায়বদ্ধতার শৃঙ্খলে যুক্ত সব পক্ষের জবাবদিহি এবং প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) নীতি ও প্রচার সমন্বয়ক বারিশ হাসান চৌধুরী বলেন, শুধু পরিবেশবান্ধব জাহাজভাঙা কারখানা হিসেবে সনদ থাকলেই শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। তিনি কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, পরিবেশগত সুরক্ষা এবং বিদ্যমান আইন ও আদালতের নির্দেশনার কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল আমিন বলেন, শ্রমিক ও মালিকপক্ষের মধ্যকার ক্ষমতার অসমতা, মামলা করতে অনীহা এবং আইনের দুর্বল প্রয়োগ শ্রমিকদের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথে বড় বাধা। তিনি রাষ্ট্রের কার্যকর ভূমিকা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) বাংলাদেশের আইনের শাসনবিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা রোমানা শোয়াইগার বলেন, ন্যায়বিচার ও কার্যকর প্রতিকার পেতে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক এবং তাঁদের পরিবারের জন্য সহজপ্রাপ্য আইনি সহায়তা প্রয়োজন। এসব ঘটনা পর্যালোচনা, প্রতিকারের পক্ষে ভূমিকা রাখা এবং পুনরাবৃত্তি রোধে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ যেন সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেয়, তা নিশ্চিত করতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

গোলটেবিল আলোচনায় উঠে আসে যে, জাহাজভাঙা শিল্পে শ্রমিকের মৃত্যু ও কর্মক্ষেত্রের দুর্ঘটনার প্রতিকার এককালীন ক্ষতিপূরণে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত ও ন্যায়সংগত ক্ষতিপূরণ, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন, মানসিক সহায়তা, সন্তানদের শিক্ষা, স্বাধীন তদন্ত, দায় নির্ধারণ এবং পুনরাবৃত্তি রোধের নিশ্চয়তাসহ একটি পূর্ণাঙ্গ ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক প্রতিকার কাঠামো প্রয়োজন।

একই সঙ্গে জাহাজ মালিক, জাহাজ ক্রয়কারী মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান এবং জাহাজভাঙা কারখানা কর্তৃপক্ষসহ শিল্পের বিভিন্ন পর্যায়ে বিদ্যমান দায়বদ্ধতার ফাঁক দূর করে কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়। অংশ গ্রহণকারীরা বলেন, শ্রমিকের নিরাপত্তা, দুর্ঘটনার স্বাধীন তদন্ত, ন্যায়সংগত ক্ষতিপূরণ, দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন এবং পুনরাবৃত্তি রোধকে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ হিসেবে নয়, বরং একটি সমন্বিত জবাবদিহি ও প্রতিকার কাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

আলোচনাটি সঞ্চালনা করেন সপ্রানের গবেষক জেবা সাজিদা সারাফ।

Recent comments

Latest Comments section by users

No comment available

সর্বশেষ সংবাদ





টাঙ্গাইলে পুকুর থেকে বৃদ্ধের মরদেহ উদ্ধার
টাঙ্গাইলে পুকুর থেকে বৃদ্ধের মরদেহ উদ্ধার
৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রাত ০৮:৩০:৫০

ভাতিজাকে অপহরণের পর হত্যা, চাচার যাবজ্জীবন
ভাতিজাকে অপহরণের পর হত্যা, চাচার যাবজ্জীবন
৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রাত ০৮:২২:৪৯



আটঘরিয়ায় ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতিকে গুলি করে হত্যা
আটঘরিয়ায় ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতিকে গুলি করে হত্যা
৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সন্ধ্যা ০৭:৩৪:১২