মো. ইরফান উদ্দিন ইরো: "আমি হয়ত তার অযোগ্য মানুষ, তার যেমনে পছন্দ হেমনে চলুক। আল্লাহর কাছে ছাইরা দিছি।" মতিঝিলের ফুটপাতে বসে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় ক্ষতটা যখন এভাবে বর্ণনা করছিলেন আসমা বেগম (৩৮) তখন তার কণ্ঠে কোনো হাহাকার ছিল না। ছিল এক নিদারুণ নির্লিপ্ততা।
বোরকা আর নেকাবের আড়ালে লুকানো চোখ দুটো ছলছল করলেও হাতের বটি থামেনি এক মুহূর্তের জন্যও। পরম মমতায় কচুর লতি পরিষ্কার করছেন তিনি।


মতিঝিলের ব্যস্ত ফুটপাতে প্রতিদিন কত মানুষ কত প্রয়োজনে ছোটাছুটি করেন। সেই ভিড়ের এক কোণে ৫ বছর ধরে বসে আছেন আসমা।

সামনে সাজানো স্তূপীকৃত কচুর লতি। নিপুণ হাতে লতির আঁশ ছাড়াচ্ছেন আর ছোট পলিথিনে সাজিয়ে রাখছেন রান্নার উপযোগী করে।
পথচারীরা চলার পথে সহজেই কিনে নিচ্ছেন পরিষ্কার করা এই সবজি।
কিন্তু এই সাধারণ লতি বিক্রির আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অসামান্য লড়াকু মায়ের গল্প।
আসমার জীবনের গল্পটা আর দশটা সাধারণ নারীর মতোই রঙিন হতে পারতো।
সতেরো বছর আগে এক দিনমজুরের সঙ্গে ঘর বেঁধেছিলেন। কিন্তু বিয়ের মাত্র দেড় বছরের মাথায় শুরু হয় ভাঙন। আসমা তখন অন্তঃসত্ত্বা। ঠিক সেই মুহূর্তে তাকে না জানিয়ে, স্বামী জড়িয়ে পড়েন দ্বিতীয় বিয়েতে।
আসমার গর্ভের সন্তান যখন তিন মাস তখন নতুন স্ত্রীকে নিয়ে আসমাকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে নিরুদ্দেশ হন সেই দিনমজুর স্বামী।
কূলহারা আসমা শুরুতে ভেঙে পড়েছিলেন। অভাব আর অপমানের জ্বালায় একসময় বেছে নিতে চেয়েছিলেন আত্মহত্যার মতো মহাপাপ।
কিন্তু কোলের শিশুটির মায়াবী মুখ তাকে জীবন যুদ্ধে ফিরিয়ে আনে। সিদ্ধান্ত নেন যেই বাবা অমানুষ হয়ে ছেড়ে গেছে, সেই বাবার অভাব ঘুচিয়ে তিনি নিজেই হবেন সন্তানের মা এবং বাবা।
লড়াইয়ের শুরুতে আসমা একটি হাসপাতালে পরিচ্ছন্নতা কর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু সেখানে দীর্ঘ সময় ডিউটি করার কারণে সন্তানকে সময় দিতে পারছিলেন না।
আসমা বলেন, আমার পোলাডারে জন্ম থেকে আমি ছাড়া দেখাশোনার কিউ আছিলো না। সময় দেওয়ার কেউ ছিলো না, তিনবেলা খাবারের সামর্থ্যের জন্য হাসপাতালে কাজ করলে টাকা পাইতাম ঠিকই, কিন্তু পোলাডারে সময় দিতে পারতাম না। যার জন্য আমার বেঁচে থাকা, তার যদি ঠিকঠাক দেখাশোনা করতে না পারি, তবে এই জীবন আর কষ্টের দাম কী?"
সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে সেই নিরাপদ চাকরি ছেড়ে ৫ বছর আগে মতিঝিলের ফুটপাতে বসেন কচুর লতি নিয়ে। এখন প্রতিদিন বিভিন্ন আড়ত থেকে লতি কিনে এনে তা কেটেকুটে তৈরি করেন। আসমার সেই তিলে তিলে করা ত্যাগের ফল আজ দৃশ্যমান তার সেই তিন মাসের শিশুটি এখন বড় হয়ে উচ্চমাধ্যমিকে পড়াশোনা করছে।
ফুটপাতের এই আয় দিয়েই চলছে ছেলের পড়ার খরচ আর সংসার।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, দীর্ঘ আলাপচারিতায় একবারের জন্যও স্বামী বা তার ভাগ্যকে গালি দেননি এই নারী। বরং নিজের সাথে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত সকল ঘটনাকে ‘ভাগ্য’ দায়ী করে পরম শ্রদ্ধায় নিজের শ্রমকে আঁকড়ে ধরেছেন। আসমা শুধু একজন প্রতারিত স্ত্রী নন, তিনি এক অপরাজেয় সৈনিকের প্রতিচ্ছবি।
আমাদের সমাজে আসমার মতো অসংখ্য নারী আজও জানেন না তাদের আইনি অধিকার কী। দেনমোহর বা খোরপোশের দাবি না তুলে তারা মুখ বুজে সহ্য করেন সব বঞ্চনা।
আসমাও তেমনই একজন, যিনি কেবল নিজের আত্মসম্মান আর মাতৃত্বের টানকে পুঁজি করে বেঁচে আছেন। তার স্বপ্ন একটাই বাপ অমানুষ হলেও সন্তান যেন মানুষের মতো মানুষ হয়।
মতিঝিলের ফুটপাতে আসমার এই নীরব লড়াই যেন সমাজকে মনে করিয়ে দেয়, অন্ধকারের শেষেও আলোর পথ থাকে, যদি সাথে থাকে অদম্য ইচ্ছাশক্তি।
(এই ওয়েবসাইটের যেকোনো কিছু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি)
© 2026, এশিয়ান অনলাইন টিভি  |  সর্বস্বত্ব সংরক্ষিতDeveloped by Future IT
Recent comments
Latest Comments section by users
No comment available