• ঢাকা
  • |
  • বুধবার ১০ই আষাঢ় ১৪৩৩ রাত ০৮:০৯:৫২ (24-Jun-2026)
  • - ৩৩° সে:
যুক্তরাষ্ট্রকে পেছনে ফেলে বিশ্বের দ্রুততম সুপারকম্পিউটার এখন চীনের দখলে

যুক্তরাষ্ট্রকে পেছনে ফেলে বিশ্বের দ্রুততম সুপারকম্পিউটার এখন চীনের দখলে

ডেস্ক রিপোর্ট: বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সুপারকম্পিউটারের তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রকে পেছনে ফেলে শীর্ষস্থান দখল করেছে চীন। অত্যাধুনিক কম্পিউটিং প্রযুক্তিতে বেইজিংয়ের দ্রুত অগ্রগতির নতুন উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে এই অর্জনকে।জার্মানির হামবুর্গে মঙ্গলবার প্রকাশিত দ্বিবার্ষিক ‘শীর্ষ ৫০০’ সুপারকম্পিউটার তালিকা অনুযায়ী, চীনের ‘লাইনশাইন’ এখন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সুপারকম্পিউটার। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ‘এল ক্যাপিটান’-কে সরিয়ে শীর্ষস্থান দখল করেছে।শেনঝেনের ন্যাশনাল সুপারকম্পিউটিং সেন্টারে স্থাপিত লাইনশাইন প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২ দশমিক ১৯৮ এক্সাফ্লপস পারফরম্যান্স অর্জন করেছে। অর্থাৎ এটি প্রতি সেকেন্ডে ২ কুইন্টিলিয়নের বেশি (২০ লাখ ট্রিলিয়নের বেশি) হিসাব সম্পন্ন করতে সক্ষম। সর্বশেষ তালিকা অনুযায়ী, লাইনশাইন যুক্তরাষ্ট্রের এল ক্যাপিটানের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন।চীনের কোনও সুপারকম্পিউটার সর্বশেষ ২০১৭ সালে এই তালিকার শীর্ষে উঠেছিল। সে সময় সানওয়ে তাইহুলাইট বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সুপারকম্পিউটার হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল।অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার লরেন্স লিভারমোর ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিতে থাকা এল ক্যাপিটান ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে শীর্ষ অবস্থানে ছিল।শীর্ষ ৫০০ তালিকায় তৃতীয় স্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্রন্টিয়ার, যা টেনেসির ওক রিজ ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিতে অবস্থিত। এরপর রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অরোরা এবং জার্মানির জুলিক সুপারকম্পিউটিং সেন্টারের জুপিটার।শীর্ষ ২০টি সুপারকম্পিউটারের তালিকায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি, নেদারল্যান্ডস ও সুইজারল্যান্ডের সিস্টেমও রয়েছে।‘শীর্ষ৫০০’ তালিকার অন্যতম সংগঠক এবং টেনেসি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞানের অধ্যাপক জ্যাক ডংগারা বলেন, লাইনশাইনের সাফল্য দেখিয়েছে যে, উন্নত কম্পিউটিং প্রযুক্তিতে চীন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতা চালিয়ে যেতে সক্ষম।তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা উন্নত চিপ রফতানি নিষেধাজ্ঞা চীনের অগ্রগতিকে কিছু ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত করলেও একই সঙ্গে দেশটিকে নিজস্ব প্রযুক্তি উন্নয়নে উৎসাহিত করেছে।ডংগারার ভাষায়, “রফতানি নিয়ন্ত্রণ চীনের উন্নত প্রযুক্তিতে প্রবেশ সীমিত করতে পারে, তবে এটি দেশটিকে নিজস্ব বিকল্প প্রযুক্তি তৈরির জন্য আরও উৎসাহিত করছে।”তার মতে, লাইনশাইনের সাফল্যের পেছনে রয়েছে বড় ধরনের বিনিয়োগ এবং হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের সমন্বিত উন্নয়ন।সাধারণত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি পরিচালনার জন্য শক্তিশালী গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট (জিপিইউ) ব্যবহার করা হয়। তবে লাইনশাইনের বিশেষত্ব হলো- এটি সম্পূর্ণভাবে সেন্ট্রাল প্রসেসিং ইউনিট (সিপিইউ) নির্ভর।শীর্ষ৫০০ তালিকা অনুযায়ী, সিপিইউ-ভিত্তিক নকশায় ২ এক্সাফ্লপসের বেশি পারফরম্যান্স অর্জন করা বিশ্বের প্রথম ও একমাত্র সুপারকম্পিউটার এটি।তবে জিপিইউ-এর তুলনায় সিপিইউ জটিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল পরিচালনায় সাধারণত ধীরগতির হয়। বিশেষ করে চ্যাটজিপিটি বা  ক্লড-এর মতো বড় এআই মডেল চালাতে জিপিইউ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।‘শীর্ষ৫০০’ তালিকার গুরুত্ব ও সীমাবদ্ধতা১৯৯৩ সাল থেকে প্রতি বছর দুইবার প্রকাশিত হচ্ছে ‘শীর্ষ৫০০’ তালিকা। কম্পিউটার বিজ্ঞানী এরিখ স্ট্রোমায়ের ও হ্যান্স মেউয়ার বিশ্বের সুপারকম্পিউটারগুলোর সক্ষমতা পরিমাপের জন্য এই তালিকা তৈরি শুরু করেন।তালিকায় সুপারকম্পিউটারের কর্মক্ষমতা নির্ধারণ করা হয় লিনপ্যাক বেঞ্চমার্কের মাধ্যমে। এতে বড় ধরনের গাণিতিক সমীকরণ সমাধানে কম্পিউটারের গতি পরিমাপ করা হয়।তবে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, বর্তমান এআই যুগে শুধু ‘শীর্ষ৫০০’ তালিকা দিয়ে প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব বিচার করা পুরোপুরি সম্ভব নয়।ডংগারা বলেন, এই তালিকা মূলত একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ডের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব নির্ধারণে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ব্যবহার, শক্তি দক্ষতা, সফটওয়্যার সক্ষমতা, নির্ভরযোগ্যতা এবং গবেষকদের ব্যবহারের সুবিধাও গুরুত্বপূর্ণ।গত এক দশক ধরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত চিপ ও সুপারকম্পিউটিং প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে।দুই দেশই একে অপরের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি সীমিত করতে বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা ও রফতানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে।স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৬ এআই সূচক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এআই মডেলের সক্ষমতায় চীন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যবধান অনেকটাই কমিয়ে এনেছে।প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র এখনও সবচেয়ে উন্নত এআই মডেল তৈরিতে এগিয়ে থাকলেও শিল্প রোবট স্থাপন ও প্রযুক্তি পেটেন্টের ক্ষেত্রে চীনের বড় অগ্রগতি রয়েছে।প্রযুক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারসেক্ট৩৬০ রিসার্চের সহপ্রতিষ্ঠাতা অ্যাডিসন স্নেল বলেন, বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো চাইলে ‘শীর্ষ৫০০’ তালিকার শীর্ষে আসতে পারতো, তবে তারা সাধারণত এতে অংশ নেয় না।তিনি বলেন, সুপারকম্পিউটিংয়ের এই তালিকা এখনও বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ব্যবহৃত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটারের সক্ষমতা বোঝার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।স্নেলের মতে, “এআই-তে আধিপত্য মানেই বিজ্ঞানে আধিপত্য নয়।”তিনি বলেন, ছবি তৈরি, অনুবাদ বা চ্যাটবটের মতো ভোক্তামুখী এআই ব্যবহারের পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য এআই ব্যবহারে বিনিয়োগ জরুরি।বিশেষজ্ঞদের মতে, লাইনশাইনের সাফল্য শুধু একটি সুপারকম্পিউটারের জয় নয়; এটি বিশ্ব প্রযুক্তি নেতৃত্বের লড়াইয়ে চীনের অবস্থান আরও শক্তিশালী হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।সূত্র: আল-জাজিরা