• ঢাকা
  • |
  • শনিবার ৫ই বৈশাখ ১৪৩৩ রাত ০৯:০৩:৩০ (18-Apr-2026)
  • - ৩৩° সে:
রিকশাচালক সুমির মেয়ে হবে ডাক্তার !

রিকশাচালক সুমির মেয়ে হবে ডাক্তার !

ইরফান উদ্দিন ইরো : "আমার স্বামী আমারে ফালাইয়া গেছে গা..."ভাঙা গলায় কথাগুলো বলতে বলতে চোখের কোণে জমে থাকা জল আড়ালের চেষ্টা করছিলেন সুমি আক্তার (২৭)। রাজধানীর মানিকনগর এলাকায় তপ্ত পিচঢালা রাস্তায় রিকশা চালিয়ে এখন জীবনযুদ্ধ চালাচ্ছেন এই অকুতোভয় নারী। অভাবের তাড়নায় একসময় ভিক্ষা করলেও, একমাত্র মেয়ের সুন্দর ভবিষ্যতের কথা ভেবে এখন তিনি রিকশার হ্যান্ডেল চেপে লড়ছেন ব্যস্ত শহরের রাজপথে।​অভাব আর প্রতারণার নিষ্ঠুর গল্প :সুমির জন্ম ও বেড়ে ওঠা চরম দারিদ্র্যের মাঝে। শৈশব থেকেই বাবা-মায়ের সঙ্গে দিনমজুরের কাজ করেছেন। অভাবের সঙ্গে লড়াই করতে করতেই কিশোরী বয়সে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন তিনি। স্বামীও ছিলেন দিনমজুর। কিন্তু সুমি যখন অন্তঃসত্ত্বা, তখনই এক নিষ্ঠুর বাস্তবতার মুখোমুখি হন তিনি। সন্তানের দায়িত্ব নিতে হবে এই ভয়ে স্বামী তাকে ফেলে পালিয়ে যান। সেই থেকে শুরু হয় সুমির একা পথচলা।​ভিক্ষাবৃত্তি থেকে রিকশার হ্যান্ডেলে :স্বামী চলে যাওয়ার পর দিশেহারা সুমি পেটের তাগিদে প্রথমে ভিক্ষা শুরু করেন। একদিন ভিক্ষা করার সময় রাস্তায় দুর্ঘটনার শিকার হন তিনি। আজও তার হাতের ক্ষত সেই দুঃসহ স্মৃতি বহন করছে। এরপর মেয়ের কথা ভেবে ভিক্ষা ছেড়ে ছোটোখাটো ব্যাবসা করার চেষ্টা করলেও সফল হতে পারেননি। শেষমেষ জীবন সংগ্রামে টিকে থাকতে অদম্য সাহসে বেছে নেন রিকশা চালানো।পথে পথে বাধা ও সামাজিক লাঞ্ছনা: নারী হয়ে রিকশা চালানো এই শহরে মোটেও সহজ নয়। সুমি জানান, নারী চালক দেখে অনেক যাত্রী রিকশায় উঠতে দ্বিধাবোধ করেন। এছাড়া রাস্তাঘাটে বখাটেদের টিপ্পনী আর হাসি-ঠাট্টা তাকে নিয়মিত সহ্য করতে হয়। যাত্রী থাকুক বা না থাকুক, দিন শেষে রিকশা মালিকের জমার টাকা ঠিকই বুঝিয়ে দিতে হয় তাকে। এত প্রতিকূলতার মাঝেও হার মানেননি তিনি।​মেয়ের স্বপ্নই বেঁচে থাকার শক্তি :সুমি নিজে অক্ষরজ্ঞানহীন। লজ্জিত মুখে বলেন, "আমি মূর্খ মানুষ গো ভাই, মেয়ে কিসে পড়ে হেইডা ঠিকমতো কইতে পারিনা।" তবে মেয়ের শিক্ষার প্রশ্নে তিনি আপসহীন। নিজে খেয়ে না খেয়ে মেয়েকে পড়াশোনা করাচ্ছেন। তার বুকভরা আশা, মেয়ে বড় হয়ে একদিন ডাক্তার হবে এবং মায়ের সব দুঃখ ঘুচিয়ে দেবে। মেয়ের কথা বলতেই সুমির অশ্রুসজল চোখে এক চিলতে হাসির ঝিলিক দেখা যায়।সরকারের কাছে আকুতি :সমাজের অবহেলিত আর প্রতারিত নারীদের নিয়ে ভাবেন সুমি। তিনি সরকারের কাছে আবেদন জানিয়ে বলেন, "আমার মতো যেসব নারীরা স্বামীর কাছে প্রতারিত হয়ে পথে বসেছে, সরকার যেন তাদের একটা করে অটোরিকশা বা সেলাই মেশিন উপহার দেয়। তাহলে তারা খারাপ পথে না গিয়ে সম্মানের সাথে বাঁচতে পারবে। নয়তো অনেক নারী জীবন্ত লাশ হয়ে ধুঁকে ধুঁকে মরে।"​রাজধানীর রাজপথে সুমির রিকশার চাকা ঘুরছে নিরন্তর। এই চাকা শুধু যান্ত্রিক কোনো ঘূর্ণন নয়, বরং এটি এক অদম্য মায়ের স্বপ্ন আর সংগ্রামের জয়যাত্রা।