টানা তৃতীয় দিনও হয়নি সংঘাত, কূটনৈতিক সমাধানের আশায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে টানা তৃতীয় দিনের মতো সরাসরি সংঘাত বন্ধ থাকায় আবারও কূটনৈতিক সমাধানের আশা দেখা দিয়েছে। কাতার ও পাকিস্তানের নেতৃত্বে মধ্যস্থতাকারীরা দুই দেশকে পুনরায় আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। যদিও উভয় পক্ষের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনা এখনো শুরু হয়নি, তবুও সাম্প্রতিক পরিস্থিতি ঘিরে পর্দার আড়ালে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।২৭ জুলাই সোমবার (বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানায়, মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার দূরত্ব কমাতে কাতার-পাকিস্তান সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। তাদের এই প্রচেষ্টার ইঙ্গিত মিলেছে ওয়াশিংটনের বক্তব্যেও।একইসঙ্গে, প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলা উত্তেজনার পর যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলা আপাতত বন্ধ থাকাও পরিস্থিতিকে কিছুটা ইতিবাচক বলে মনে করা হচ্ছে।তবে, সম্ভাব্য আলোচনা নিয়ে প্রকাশ্যে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না ইরান। বরং সৌদি আরব, জর্ডান ও ইরাকের দিকে ইরানের ড্রোন হামলা পরিস্থিতির ভঙ্গুরতাকেই সামনে এনেছে।এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান তাদের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সরাসরি বৈঠকের অনুরোধ জানিয়েছে। এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, 'এই মুহূর্তে আমরা ইরানের সঙ্গে কথা বলছি। আলোচনা ভালোভাবেই এগোচ্ছে।'তবে একইসঙ্গে ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে ইরানকে কঠিন পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে।অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র ট্রাম্পের দাবি নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, তেহরান শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরু করার কোনো অনুরোধ জানায়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মধ্যস্থতাকারীরা বিভিন্ন বার্তা পৌঁছে দিতে পারেন বলে উল্লেখ করেন তিনি। একইসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন, দুই দেশের মধ্যে বর্তমানে কোনো সরাসরি আলোচনা চলছে না।চলতি মাসের শুরুতে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে ইরানের হামলার জেরে উত্তেজনা দ্রুত বেড়ে যায়। এর পরবর্তী প্রায় দুই সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের উপকূলীয় এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে একাধিক হামলা চালায়। গত শনিবার সেই হামলা আপাতত স্থগিত করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।টানা ১৩দিন যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে, যেখানে মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে, সেখানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় ইরান। এতে জর্ডানে একটি ঘাঁটিতে অন্তত তিনজন এবং ইরাকে একজন মার্কিন সেনা নিহত হন।মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পর্যাপ্ত গোলাবারুদ রয়েছে। তিনি জানান, দেশটি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য নতুন ইন্টারসেপ্টর তৈরি করছে এবং মজুত বাড়ানো হচ্ছে। সাম্প্রতিক বিরতির পেছনে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতি কাজ করেছে, এমন খবরও তিনি উড়িয়ে দেন।আল জাজিরার প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মধ্যস্থতাকারীরা এখনো দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করছেন এবং উভয় দেশকে আবার আলোচনায় ফিরিয়ে আনতে আগ্রহী। তাদের লক্ষ্য, জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে হওয়া সমঝোতা স্মারক (মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং) পুনরুজ্জীবিত করা, যার মাধ্যমে আগের দফায় সংঘাত বন্ধ হয়েছিল।তবে সেই সমঝোতার ব্যাখ্যা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে এখনো মতপার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিয়ম বড় ধরনের বিরোধের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।ইরান চায়, জাহাজগুলো তাদের উপকূলের কাছাকাছি নির্ধারিত নৌপথ ব্যবহার করুক। অন্যদিকে ওমান উপকূলঘেঁষা দক্ষিণ দিকের নৌপথ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে হামলা চালানোর অভিযোগ রয়েছে তেহরানের বিরুদ্ধে।এই অচলাবস্থা নিরসনে ওমান একটি প্রস্তাব দিয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী দেশগুলো স্বেচ্ছায় নির্ধারিত টোল পরিশোধ করবে। কিন্তু ইরানের অবস্থান, এই টোল বাধ্যতামূলক হতে হবে।সপ্তাহান্তে এ বিষয়ে কিছু অগ্রগতি হলেও চূড়ান্ত সমাধান নিয়ে এখনো দুই পক্ষের অবস্থান অনেক দূরে। ইরানের দাবি, যুদ্ধ-পূর্ব পরিস্থিতিতে আর ফেরা সম্ভব নয় এবং কোনো না কোনো ধরনের টোল ব্যবস্থা থাকতেই হবে। তবে সেই অর্থ প্রবেশ ফি, প্রস্থান ফি কিংবা ইরান ও ওমানের দেওয়া কোনো সেবার বিনিময়ে আদায় হবে কি না—সেটি নিয়ে তারা আলোচনায় আগ্রহী।এদিকে, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী ১৭টি বাণিজ্যিক জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করা হয়েছে। পাশাপাশি, আরও দুটি জাহাজের কার্যক্রম বন্ধ করে দুটি জাহাজে তল্লাশি চালানো হয়েছে, যাতে ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত নৌ অবরোধ কার্যকর থাকে।এর আগে, সমঝোতা স্মারক ভেঙে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানি তেল বিক্রির ওপর দেওয়া বিশেষ ছাড় বাতিল করে এবং ইরানের বিভিন্ন বন্দরের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ জারি করে।সূত্র: যমুনা টিভি