• ঢাকা
  • |
  • বৃহঃস্পতিবার ১৯শে ভাদ্র ১৪৩৩ সন্ধ্যা ০৬:৫১:৫৭ (03-Sep-2026)
  • - ৩৩° সে:
ইরান যুদ্ধের চাপে গভীর সংকটে মার্কিন সামরিক বাহিনী

ইরান যুদ্ধের চাপে গভীর সংকটে মার্কিন সামরিক বাহিনী

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বিশ্বজুড়ে সামরিক প্রভাব বিস্তারের নীতিতে অভ্যস্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন অভ্যন্তরীণ ও কৌশলগত সংকটে জর্জরিত হয়ে পড়েছে। পেন্টাগনের শীর্ষ নেতৃত্বের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে বিশৃঙ্খলা, জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডারদের পদত্যাগ এবং মারাত্মকভাবে অস্ত্রাগারের শূন্যতা ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সক্ষমতাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। এই সংকট কেবল কোনো একক সামরিক অভিযানের প্রত্যক্ষ খরচের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই বরং এটি ক্ষমতার কাঠামোগত দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগের মেয়াদেও হোয়াইট হাউস ও সামরিক শীর্ষ কমান্ডারদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা গিয়েছিল। তবে মার্কিন সংবাদ মাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বর্তমান প্রশাসনে কমান্ড কাঠামোতে যে মাত্রায় রদবদল ও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তার নজির ইতিহাসে বিরল। সাম্প্রতিক সময়ে বিশজনেরও বেশি জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে অপসারণ করা এবং বহু কমান্ডারের পদোন্নতি আটকে দেওয়ার ঘটনা মার্কিন সামরিক বাহিনীর সামগ্রিক স্থায়িত্ব ও চেইন অব কমান্ডকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করেছে।এই চরম প্রশাসনিক অস্থিতিশীলতা এমন এক মুহূর্তে দেখা দিয়েছে, যখন মার্কিন বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সাথে দীর্ঘায়িত এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল যুদ্ধে জড়িয়ে রয়েছে। মার্কিন আর্মি সেক্রেটারি ড্যান ড্রিসকলের পদত্যাগ এই সাম্প্রতিক উত্তেজনার সবচেয়ে বড় নিদর্শন। ওয়ার সেক্রেটারি পিট হেগসেথের সাথে নীতিগত ও প্রশাসনিক গভীর বিরোধের জের ধরে ড্রিসকল পদ ছাড়তে বাধ্য হন। এই বিরোধ কেবল ব্যক্তিপর্যায়ের ছিল না বরং সামরিক কমান্ড পরিচালনা এবং জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের গণহারে ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্তের সাথে সরাসরি যুক্ত ছিল।সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, একজন রাজনৈতিক কর্মকর্তা বা কয়েকজন সামরিক অধিনায়কের বিদায় আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ মনে হতে পারে কিন্তু একটি সুশৃঙ্খল সামরিক কাঠামোতে নেতৃত্বের স্থায়িত্বই হলো মূল যুদ্ধক্ষমতা। একটি সেনাবাহিনী কেবল অত্যাধুনিক বিমান, মিসাইল, যুদ্ধজাহাজ বা ট্যাংকের সমষ্টি নয় এর পেছনে কমান্ডারদের অভিজ্ঞতা, বাহিনীর ভেতরের অভ্যন্তরীণ সমন্বয় এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি বিশ্বস্ততার মতো অদৃশ্য শক্তি কাজ করে।এই দৃষ্টিকোণ থেকে ইরানের সাথে শুরু হওয়া যুদ্ধ মার্কিন বাহিনীর ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করেছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীকে এখনো প্রযুক্তি, বিমান ও নৌশক্তি, গোয়েন্দা ব্যবস্থা এবং লজিস্টিকসের দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী বলে গণ্য করা হয়, তথাপি বাস্তব সত্য হলো কোনো শক্তিরই সম্পদ অসীম নয়। হোয়াইট হাউস বর্তমানে এই যুদ্ধের প্রত্যক্ষ খরচ হিসেবে প্রায় ৩৭.৫ বিলিয়ন ডলারের হিসাব দেখালেও বাস্তবে এর প্রকৃত আর্থিক ও কৌশলগত মূল্য বহু গুণ বেশি। বিপুল পরিমাণ দূরপাল্লার নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার, সামরিক সরঞ্জামের ক্ষয়ক্ষতি, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদে সৈন্য মোতায়েন এবং সামরিক সক্ষমতা পুনঃগঠনের ব্যয় এই প্রাতিষ্ঠানিক পরিসংখ্যানে সঠিকভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না।সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রিসিজন মিউনিশন বা নিখুঁত লক্ষ্যভেদী অস্ত্র এবং ইন্টারসেপ্টর সিস্টেমের আশঙ্কাজনক ঘাটতি। যুদ্ধক্ষেত্রে পেট্রিওট মিসাইল এবং অন্যান্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসার খবর মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা ও তাদের মিত্রদের গভীরভাবে চিন্তিত করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রকে কেবল মধ্যপ্রাচ্যের জন্য অস্ত্র প্রস্তুত রাখলেই চলে না; ইউরোপ, এশিয়া-প্যাসিফিকসহ বিশ্বের অন্যান্য সংবেদনশীল অঞ্চলে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখতে বিশাল অস্ত্রের মজুত রাখতে হয়। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে ব্যবহৃত প্রতিটি ইন্টারসেপ্টর কেবল একটি গোলাবর্ষণের ঘটনা নয়, বরং এটি এশিয়া বা ইউরোপের অন্য কোনো সম্ভাব্য সংকটের জন্য সংরক্ষিত অস্ত্রের ঘাটতি তৈরি করছে।এই বাস্তবতায় মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ সরাসরি চীন ও রাশিয়ার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সাথে যুক্ত হয়ে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যদি মাসের পর মাস ধরে চলে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সেখানে বিশাল আকারের সেনা, যুদ্ধজাহাজ ও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আটকে রাখতে হয়, তবে বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে যেকোনো নতুন সংকট মোকাবিলায় মার্কিন বাহিনীর নমনীয়তা ও তাৎক্ষণিক সাড়া দেওয়ার ক্ষমতা ব্যাপকভাবে হ্রাস পাবে।বিশেষ করে তাইওয়ান ও পূর্ব এশিয়ার মার্কিন মিত্রদের জন্য এটি একটি বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মিত্র দেশগুলো কেবল ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক প্রতিশ্রুতিতে আশ্বস্ত হয় না; তারা নজর রাখে বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে কতটি যুদ্ধজাহাজ, ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদ প্রস্তুত রয়েছে এবং সংকট মুহূর্তে সেগুলো কত দ্রুত পৌঁছাতে পারবে। ফলে অস্ত্রাগারের এই ঘাটতি এখন একটি বড় রাজনৈতিক ও কৌশলগত সংকট হিসেবে দাঁড়িয়েছে।দীর্ঘমেয়াদে এই ঘাটতি পূরণ করতে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের প্রতিরক্ষা বাজেটের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করতে হবে, অস্ত্রের নতুন অর্ডার বাড়াতে হবে এবং প্রাক-যুদ্ধ অবস্থায় ফিরতে বছরের পর বছর সময় লেগে যাবে। সরঞ্জাম ছাড়াও দক্ষ মানবসম্পদের ক্ষয়ক্ষতি একটি বড় বাস্তবতা। অভিজ্ঞ কমান্ডারদের বিদায় এবং যুদ্ধরত অবস্থায় চেইন অব কমান্ডে বারবার পরিবর্তন মার্কিন বাহিনীর কার্যক্ষমতার ওপর যে প্রভাব ফেলছে, তার মূল্য আর্থিক অংকে পরিমাপ করা কঠিন।সার্বিকভাবে, যে যুদ্ধকে মার্কিন সামরিক শক্তির প্রদর্শন হিসেবে তুলে ধরার কথা ছিল, তা এখন আমেরিকার বৈশ্বিক ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সামরিক শক্তির মূল পরিমাপক কেবল যুদ্ধ শুরু করার ক্ষমতা নয় বরং দীর্ঘায়িত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া, অস্ত্রের ঘাটতি দ্রুত পূরণ করা এবং একই সাথে বিশ্বজুড়ে বহু পাক্ষিক সংকট একসঙ্গে সামাল দেওয়ার সামর্থ্য রক্ষা করা। ইরান যুদ্ধ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই অসীম ক্ষমতার ধারণাকেই বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে।সূত্র: মেহের নিউজ