• ঢাকা
  • |
  • বৃহঃস্পতিবার ২১শে কার্তিক ১৪৩৩ বিকাল ০৪:৫৯:২৫ (05-Nov-2026)
  • - ৩৩° সে:
ইউরোপের বাজারে শুল্কমুক্ত রপ্তানির বিশেষ সুবিধা হারাতে পারে পাকিস্তান

ইউরোপের বাজারে শুল্কমুক্ত রপ্তানির বিশেষ সুবিধা হারাতে পারে পাকিস্তান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে শুল্কমুক্ত পণ্য রপ্তানির বিশেষ সুবিধা হারাতে পারে পাকিস্তান। এতে দেশটির রপ্তানি খাতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপের বাজারে বছরে শত শত কোটি ইউরোর পণ্য রপ্তানির সুযোগ হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। পাকিস্তানের এক সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যানও এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তবে দেশটির সরকার বলছে, আপাতত এমন কোনো ঝুঁকি নেই।দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের অর্থবিষয়ক স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ আশঙ্কা প্রকাশ করেন কমিটির চেয়ারম্যান সৈয়দ নাভিদ কামার।বৈঠকে তিনি বলেন, মানবাধিকার পরিস্থিতির কারণে পাকিস্তানের জেনারেলাইজড স্কিম অব প্রেফারেন্সেস প্লাস (জিএসপি প্লাস) সুবিধা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে—এমন কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তবে ইইউ এ বিষয়ে কী ধরনের নেতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তা নির্দিষ্ট করে জানাননি তিনি।অন্যদিকে পাকিস্তান সরকার দাবি করেছে, জিএসপি প্লাস সুবিধা হারানোর মতো কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।ইইউর সর্বশেষ জিএসপি প্লাস পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে পাকিস্তানের মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বেশ কিছু উদ্বেগ তুলে ধরা হয়েছে। এতে বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বাধা এবং বিভিন্ন ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে।প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জোরপূর্বক গুম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা লঙ্ঘনের ঘটনা বন্ধে পাকিস্তানকে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এ জন্য ধর্ম অবমাননা, সাইবার অপরাধ, মানহানি, সন্ত্রাসবাদ দমন এবং রাষ্ট্রদ্রোহসংক্রান্ত আইন সংশোধন অথবা বাতিলের সুপারিশও করা হয়েছে।জিএসপি প্লাস হলো ইইউর বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা। এর আওতায় উন্নয়নশীল দেশগুলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে অধিকাংশ পণ্য শুল্কমুক্ত বা কম শুল্কে রপ্তানির সুযোগ পায়। তবে এ সুবিধা অব্যাহত রাখতে মানবাধিকার, শ্রম অধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা ও সুশাসনসংক্রান্ত ২৭টি আন্তর্জাতিক চুক্তি ও সনদের শর্ত মানতে হয়।বর্তমানে পাকিস্তানের জন্য জিএসপি প্লাস সুবিধার মেয়াদ ২০২৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। ২০২৯ সালের জানুয়ারি থেকে নতুন করে এ সুবিধা পাওয়ার জন্য আবেদন প্রস্তুত করছে দেশটি। এ লক্ষ্যে উপপ্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি কমিটি কাজ করছে বলে জানিয়েছেন পাকিস্তানের অর্থ ও রাজস্ববিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বিলাল কায়ানি।ইইউর জিএসপি প্লাস সুবিধার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী দেশগুলোর একটি পাকিস্তান। পঞ্চম জিএসপি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে এ সুবিধার আওতায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে ৭৫০ কোটি ইউরোর পণ্য রপ্তানি করেছে পাকিস্তান।দেশটির রপ্তানি আয় ও অর্থনীতির জন্য এ সুবিধা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কয়েক দশক ধরে রপ্তানিকারকদের বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হলেও পাকিস্তান এখনো রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারেনি। ফলে ইউরোপের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার হারালে দেশটির রপ্তানি খাতে বড় চাপ তৈরি হতে পারে।ইইউর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ সময়ে জিএসপি প্লাসের শর্ত পূরণে পাকিস্তান সমস্যার মুখে পড়েছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে এবং ইতিবাচক অগ্রগতি এসেছে খুবই সীমিত।২০২৭ সাল থেকে জিএসপি সুবিধার সংশোধিত নিয়ম কার্যকর হওয়ার কথা। ভবিষ্যতে পাকিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার, নির্যাতন বন্ধ, কারাগারের পরিবেশের উন্নয়ন, মৃত্যুদণ্ডসংক্রান্ত ব্যবস্থায় পরিবর্তন এবং জোরপূর্বক গুম বন্ধের মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেবে ইইউ।বৈঠকে পাকিস্তানের সঙ্গে ইরান ও আফগানিস্তানের সীমান্ত বন্ধ থাকার কারণে আঞ্চলিক বাণিজ্যে কী ধরনের প্রভাব পড়ছে, তা নিয়েও আলোচনা হয়।পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) জাতীয় পরিষদ সদস্য ড. নাফিসা শাহ জানতে চান, সীমান্ত বন্ধ থাকায় মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে পাকিস্তানের রপ্তানি কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।জবাবে বিলাল কায়ানি বলেন, মধ্য এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যে এর প্রভাব পড়েছে। তবে জাতীয় নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়েই আফগানিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।এ সময় মুত্তাহিদা কওমি মুভমেন্ট-পাকিস্তানের (এমকিউএম-পি) সংসদ সদস্য জাভেদ হানিফ বলেন, চীন ও ভারতের মধ্যে বিরোধ থাকা সত্ত্বেও দেশ দুটি নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য বন্ধ করেনি।এদিকে ব্যবসায়ীদের করের আওতায় আনতে সরকারের নেওয়া বিশেষ কর প্রকল্প আশানুরূপ সাড়া না পাওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছে জাতীয় পরিষদের অর্থবিষয়ক স্থায়ী কমিটি।কর বিবরণী জমা দেননি—এমন ৩৭ লাখ ব্যবসায়ীর মধ্যে ১০ লাখকে বিশেষ প্রকল্পের আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল সরকার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাত্র ২২২ জন দোকানমালিক এতে অংশ নিয়েছেন।বিলাল কায়ানি স্বীকার করেছেন, প্রকল্পটি থেকে প্রত্যাশিত সাড়া পাওয়া যায়নি। তাঁর দাবি, ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন দাবি মেনে নেওয়ার পরও তারা প্রকল্পে যোগ দিতে আগ্রহ দেখাননি।ব্যবসায়ীদের দাবির মধ্যে ছিল কর নিরীক্ষা থেকে অব্যাহতি, নির্দিষ্ট হারে কর দেওয়ার সুযোগ এবং ফেডারেল বোর্ড অব রেভিনিউর (এফবিআর) সঙ্গে যোগাযোগ এড়িয়ে চলার সুবিধা।গত ৩১ অক্টোবর প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। সরকার জানিয়েছে, এটি আর বাড়ানো হবে না। এখন কর বিবরণী জমা না দেওয়া ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে জরিমানা ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।২০২২ সালের পর এটি ছিল ব্যবসায়ীদের করের আওতায় আনতে পাকিস্তান সরকারের তৃতীয় উদ্যোগ। আগের উদ্যোগগুলোর মতো এটিও প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।বিলাল কায়ানি জানান, ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আগে অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে আলোচনা করেছে সরকার। তবে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন প্রকল্পের আওতায় প্রথমবার নিয়ম ভাঙলে ব্যবসায়ীদের ১০ হাজার রুপির নোটিশ দিয়ে কর বিবরণী জমা দিতে বলা হতে পারে। তবে এ ধরনের ব্যবস্থার আইনি ও নৈতিক দিক নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। কারণ, ব্যবসা করেন না এমন কেউ দেরিতে কর বিবরণী জমা দিলে তাঁকে ২৫ হাজার রুপি জরিমানা দিতে হয়।স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান নাভিদ কামার জানতে চান, ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা একমত কি না। ব্যবসায়ীরা ধর্মঘটের হুমকি দিলেও সরকার সিদ্ধান্তে অটল থাকবে কি না, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।জবাবে বিলাল কায়ানি বলেন, সরকার আইন প্রয়োগের বিষয়ে পুরোপুরি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ জন্য প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের লক্ষ্যে একটি পরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের ধর্মঘটের কোনো যৌক্তিকতা নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর দাবি, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করেই কর প্রকল্পটি তৈরি করা হয়েছিল।এ বিষয়ে সংসদের সমর্থনও চান অর্থ ও রাজস্ববিষয়ক প্রতিমন্ত্রী।তবে নাভিদ কামার বলেন, সব ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত জনবল এফবিআরের নেই।অন্যদিকে এফবিআরের জনবল ও আইন প্রয়োগের সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় ব্যবসায়ীদের কর বিবরণী জমা দিতে বাধ্য করতে ব্যাংক হিসাব বা অন্যান্য সেবা বন্ধের প্রস্তাব দেন জাভেদ হানিফ।জবাবে বিলাল কায়ানি জানান, সরকার বিভিন্ন সেবা বন্ধ করার বিষয়টি বিবেচনা করছে। তবে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে একেবারে শেষ উপায় হিসেবে।এটিভি/আরএম