বাজার ফান্ডের জমি আছে, ঋণ নেই; অচল পাহাড়ের ব্যবসা-বাণিজ্য! রাঙামাটিতে বিক্ষোভ
রাঙামাটি প্রতিনিধি: দোকান আছে, ব্যবসা আছে, জমিও আছে" কিন্তু সেই জমি ব্যাংকে বন্ধক রেখে ঋণ নেওয়ার সুযোগ নেই। ফলে কাগজে-কলমে মূল্যবান সম্পদ থাকলেও ব্যবসা সম্প্রসারণ কিংবা সংকটের সময়ে মূলধন সংগ্রহে তা কাজে লাগাতে পারছেন না রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের অনেক ব্যবসায়ী। দীর্ঘদিন ধরে বাজার ফান্ডের জমি নিয়ে প্রশাসনিক জটিলতায় বন্ধ রয়েছে ভূমি হস্তান্তর, বন্ধকি দলিল রেজিস্ট্রি ও ব্যাংক ঋণ কার্যক্রম। এতে পাহাড়ের ব্যবসা-বাণিজ্যে তৈরি হয়েছে মূলধন সংকট।বাজার ফান্ডের জমি বন্ধক রেখে ব্যাংক ঋণ কার্যক্রম পূর্বের মতো চালুর দাবিতে ২৯ আগস্ট শনিবার দুপুরে রাঙামাটিতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ (পিসিএনপি) ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলো।আজ শনিবার দুপুরে শহরের হ্যাপি মোড় থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে বনরূপা পুলিশ বক্সের সামনে গিয়ে সমাবেশে মিলিত হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদ (পিসিসিপি) কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. হাবীব আজমের সঞ্চালনায় সমাবেশে বক্তব্য দেন পিসিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটির চেয়ারম্যান কাজী মজিবর রহমান।পিসিএনপির নেতারা বলছেন, বাজার ফান্ডের জমিতে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা পরিচালনা করছেন বহু ব্যবসায়ী। এসব জমি ও স্থাপনা তাদের ব্যবসার সবচেয়ে বড় সম্পদগুলোর একটি। কিন্তু জমি বন্ধক রেখে ব্যাংক ঋণ নিতে না পারায় সম্পদ থাকার পরও প্রয়োজনের সময়ে ব্যবসায়ীরা অর্থ সংগ্রহ করতে পারছেন না।ব্যবসার স্বাভাবিক নিয়মে কোনো উদ্যোক্তার জমি বা স্থাপনা থাকলে সেটিকে জামানত হিসেবে ব্যবহার করে ব্যাংক থেকে মূলধন নেওয়ার সুযোগ থাকে। কিন্তু বাজার ফান্ডের জমির ক্ষেত্রে সেই সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ায় ব্যবসায়ীদের বিকল্প উৎস থেকে উচ্চ ঝুঁকিতে অর্থ সংগ্রহ করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন আন্দোলনকারীরা।তাদের ভাষ্য, একদিকে জমির মূল্য বাড়ছে, অন্যদিকে সেই জমি ব্যবসার মূলধন তৈরিতে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে সম্পদ থাকা সত্ত্বেও অনেক ব্যবসায়ী কার্যত তারল্য সংকটে ভুগছেন।সমাবেশে বক্তারা জানান, ২০১৭ সালে রাঙামাটির তৎকালীন জেলা প্রশাসক বাজার ফান্ড এলাকার ভূমি রেজিস্ট্রি ও মিউটেশন কার্যক্রম স্থগিত করেন। পরে নানা দেন-দরবারের পর কার্যক্রম চালু হলেও ২০১৯ সালে আবার তা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে ভূমি হস্তান্তর, বন্ধকি দলিল রেজিস্ট্রি ও ব্যাংক ঋণ কার্যক্রম স্বাভাবিক হয়নি। এই দীর্ঘস্থায়ী জটিলতার কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ছেন বলে দাবি করেন তারা।পিসিএনপির নেতাদের অভিযোগ, ব্যাংক ঋণ না পাওয়ায় ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ কমছে। পুরোনো ব্যবসায়ীরা নতুন করে বিনিয়োগ করতে পারছেন না, আবার নতুন উদ্যোক্তারাও ব্যবসায় নামার ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। এর প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থানেও।আন্দোলনকারীদের দাবি, বাজার ফান্ডের জমিকে কেন্দ্র করে তৈরি প্রশাসনিক জটিলতা শুধু ভূমি ব্যবস্থাপনার সমস্যা নয়; এটি এখন পাহাড়ের স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। কারণ ব্যবসায়ীদের বড় একটি অংশের সম্পদ বাজার ফান্ডের জমি ও এর ওপর গড়ে ওঠা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে আটকে আছে।তাদের মতে, জমি যদি বিক্রি, হস্তান্তর বা ব্যাংকে বন্ধক রাখার স্বাভাবিক সুযোগ না থাকে, তাহলে সেই সম্পদের অর্থনৈতিক ব্যবহারও সীমিত হয়ে যায়। এতে ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ সক্ষমতা কমে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়।পিসিএনপির নেতারা বলেন, বাজার ফান্ডের জমি নিয়ে প্রশাসনিক জটিলতা যত দীর্ঘ হবে, ততই ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।সমাবেশ থেকে বাজার ফান্ডের প্লটের লিজের মেয়াদ ৯৯ বছরে উন্নীত করা, বন্ধ থাকা ব্যাংক ঋণ কার্যক্রম পূর্বের মতো চালু করা এবং জমি ক্রয়-বিক্রয় ও নামজারির ক্ষেত্রে বিদ্যমান এলআর ফান্ডের তিন দফা ব্যবস্থা বাতিল করে দেশের অন্যান্য জেলার মতো ভূমি ব্যবস্থাপনা ও রেজিস্ট্রেশন ব্যবস্থা চালুর দাবি জানানো হয়।এ ছাড়া জমি ক্রয়-বিক্রয়, ব্যবসা, চাকরি ও শিক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সার্কেল চিফের সনদ বাতিল এবং হেডম্যান কার্যালয়ের পরিবর্তে উপজেলা ভূমি অফিসে ভূমির কর/খাজনা পরিশোধের সুযোগ সৃষ্টির দাবিও জানান বক্তারা।সমাবেশে পিসিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি ও স্থায়ী কমিটির সদস্য মো. রেজাউল করিম মাস্টার, চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান, পিসিএনপি রাঙামাটি জেলার সভাপতি মাওলানা আবু বক্কর সিদ্দিক, খাগড়াছড়ি জেলার আহ্বায়ক আব্দুল মজিদ, বান্দরবান জেলা সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন, পার্বত্য চট্টগ্রাম যুব পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূর হোসেন, মহিলা পরিষদের সভাপতি মোরশেদা আক্তার, পিসিসিপি রাঙামাটি জেলা সভাপতি তাজুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীরসহ সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।পিসিএনপির নেতৃবৃন্দ বলেন, দ্রুত বাজার ফান্ডের জমি নিয়ে জটিলতা নিরসন করে বন্ধকি দলিল রেজিস্ট্রি ও ব্যাংক ঋণ কার্যক্রম চালু করা না হলে তিন পার্বত্য জেলায় আরও কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।ব্যবসায়ীদের মূল প্রশ্ন এখন একটাই? বছরের পর বছর যে জমি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান তাদের সম্পদ হিসেবে রয়েছে, সেই সম্পদ যদি প্রয়োজনের সময়ে ব্যাংক ঋণের জামানত হিসেবেও কাজে না লাগে, তাহলে সেই সম্পদের অর্থনৈতিক মূল্য তারা কতটা কাজে লাগাতে পারবেন?