• ঢাকা
  • |
  • শুক্রবার ১৫ই কার্তিক ১৪৩৩ রাত ০৮:৫৩:৪৬ (30-Oct-2026)
  • - ৩৩° সে:
পাখির আঘাত ঠেকাতে দেশের সব বিমানবন্দরে বেবিচকের উদ্যোগ

পাখির আঘাত ঠেকাতে দেশের সব বিমানবন্দরে বেবিচকের উদ্যোগ

অনলাইন ডেস্ক: দেশের সব বিমানবন্দরে উড়োজাহাজের সঙ্গে পাখির সংঘর্ষের ঝুঁকি কমাতে ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। এ লক্ষ্যে পাখি তাড়ানোর আধুনিক সরঞ্জাম সংগ্রহ, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং বন্যপ্রাণীজনিত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা জোরদারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।আগামী ২ থেকে ৩ বছরের মধ্যে দেশের সব চালু বিমানবন্দরে পর্যাপ্ত পাখি নিয়ন্ত্রণের সরঞ্জাম, প্রশিক্ষিত জনবল এবং কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায় সংস্থাটি। এর মাধ্যমে উড়োজাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি বিমান চলাচলের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে।বেবিচকের সদস্য (এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট) এয়ার কমোডর মো. নূর-ই-আলম জানান, বিদ্যমান সরঞ্জাম ও জনবল সংকট দূর করার পাশাপাশি পাখিজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় একটি টেকসই ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তুলতে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।তিনি জানান, দেশের ৮টি বিমানবন্দরে পাখি তাড়ানোর বন্দুকের প্রয়োজনীয়তা যাচাই করে মোট ২৬টি বন্দুকের চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে।এই হিসাব অনুযায়ী, ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৬টি বন্দুক প্রয়োজন। চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং কক্সবাজার বিমানবন্দরে প্রয়োজন ৪টি করে। রাজশাহী, সৈয়দপুর, যশোর ও বরিশাল বিমানবন্দরে প্রয়োজন ২টি করে বন্দুক।বর্তমানে বেবিচকের কাছে ১১টি পাখি তাড়ানোর বন্দুক রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ২টি সচল। সিলেট ও বরিশাল বিমানবন্দরে ১টি করে বন্দুক ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় রয়েছে।বন্দুকগুলোর লাইসেন্স নবায়ন এবং পরবর্তী সময়ে নতুন সরঞ্জাম সংগ্রহের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ।নূর-ই-আলম বলেন, সচল সরঞ্জামের পর্যাপ্ততা নিশ্চিত করা গেলে বিমানবন্দরের রানওয়ে ও উড়োজাহাজ চলাচলের এলাকায় পাখি তাড়ানো সহজ হবে। বিশেষ করে উড়োজাহাজের উড্ডয়ন ও অবতরণের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এ ব্যবস্থা কার্যকর ভূমিকা রাখবে।সরঞ্জাম সংগ্রহের পাশাপাশি পাখি নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে জনবল বাড়ানোর প্রস্তুতিও নিচ্ছে বেবিচক। নিয়মিত নজরদারি ও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম কার্যকর রাখতে এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, দেশের বিমানবন্দরগুলোতে পাখি তাড়ানোর জন্য মোট ৬৪ জন কর্মী প্রয়োজন। বর্তমানে এ কাজে অনুমোদিত পদ রয়েছে ১০টি। এর মধ্যে কর্মরত আছেন মাত্র ৪ জন।নূর-ই-আলম বলেন, বিদ্যমান ও ভবিষ্যৎ জনবলের চাহিদা পূরণে বেবিচকের জনবল কাঠামো (টিওঅ্যান্ডই) পর্যালোচনা করা হচ্ছে।প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও কক্সবাজার বিমানবন্দরে ১১ জন করে পাখি তাড়ানোর কর্মী প্রয়োজন হবে। অন্যদিকে রাজশাহী, সৈয়দপুর, যশোর ও বরিশাল বিমানবন্দরে প্রয়োজন হবে ৫ জন করে।এর ফলে বিশেষ করে প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে দিন-রাত পাখি নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।এদিকে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও যশোর বিমানবন্দরে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পাখি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা দিচ্ছে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী।বেবিচক নিজস্ব সরঞ্জাম ও জনবল বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি বিমানবাহিনীর এ সহায়তায় বর্তমানে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।দীর্ঘমেয়াদি বিমান চলাচল নিরাপত্তা কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরে পর্যায়ক্রমে আধুনিক পাখি নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি ব্যবস্থা (বিসিএমএস) চালুর পরিকল্পনা রয়েছে বেবিচকের।নূর-ই-আলম বলেন, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইতোমধ্যে এ ধরনের একটি কার্যকর ব্যবস্থা রয়েছে। অন্যান্য বিমানবন্দরে একই ধরনের ব্যবস্থা চালুর ক্ষেত্রে এটিকে নমুনা হিসেবে কাজে লাগানো হবে।নজরদারি ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রশিক্ষিত জনবল ও পাখি তাড়ানোর সরঞ্জাম যুক্ত হলে বিমানবন্দরের পরিচালন এলাকায় পাখিজনিত ঝুঁকি শনাক্ত ও মোকাবিলা আরও কার্যকর হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ ছাড়া পাখি নিয়ন্ত্রণের সরঞ্জামের রক্ষণাবেক্ষণ, লাইসেন্স এবং সেগুলোর নিয়মিত ব্যবহার নিশ্চিত করতেও বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে কর্তৃপক্ষ।পাখি তাড়ানোর আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স নিয়ে প্রশাসনিক জটিলতা দূর করতেও উদ্যোগ নিয়েছে বেবিচক।আগে নির্দিষ্ট কর্মকর্তার নামে এসব অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হতো। ফলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বদলি বা অবসরে গেলে লাইসেন্স নিয়ে জটিলতা তৈরি হতো।সম্প্রতি বিধিগত ছাড়ের মাধ্যমে ব্যক্তির পরিবর্তে নির্দিষ্ট পদ বা দপ্তরের নামে লাইসেন্স দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।এতে পাখি নিয়ন্ত্রণের সরঞ্জামের লাইসেন্স নবায়ন, নতুন সরঞ্জাম সংগ্রহ এবং সেগুলোর ব্যবহার অব্যাহত রাখা সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। শুধু সরঞ্জাম ও জনবল বাড়িয়ে পাখির আঘাতের ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়- এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বিমানবন্দরগুলোর আশপাশের পরিবেশ উন্নয়নেও জোর দিয়েছে বেবিচক।বিমানবন্দর এলাকায় উড়োজাহাজ চলাচলের স্থানের আশপাশে পাখির আনাগোনা কমাতে অতিরিক্ত গাছপালা ও ঝোপঝাড় পরিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।এ ছাড়া আবর্জনা ফেলা ও মজুতের স্থানগুলো সরিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনগুলোর সহযোগিতা চেয়েছে কর্তৃপক্ষ। বিশেষ করে যেসব স্থানে খাবারের উচ্ছিষ্ট জমে পাখির সমাগম ঘটে, সেগুলো অপসারণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।নূর-ই-আলম বলেন, বিমানবন্দরের সীমানার বাইরেও বন্যপ্রাণীজনিত ঝুঁকি রয়েছে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পক্ষের মধ্যে সমন্বয় জরুরি।এর আগে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালিত গবেষণায় ঢাকায় ১১৫ থেকে ১২০ প্রজাতির পাখির সন্ধান পাওয়া যায়। এর মধ্যে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও এর আশপাশে ছিল ৬৬ থেকে ৬৭ প্রজাতির পাখি।বিমানবন্দরের ১০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে ১২৯টি স্থানে পরিচালিত ওই গবেষণায় ৩ হাজার ৮৮৬টি হোটেল ও রেস্তোরাঁ, ৭৫৩টি তাজা শাকসবজি ও কৃষিপণ্যের বাজার, ৬৬৩টি কসাইখানা এবং ১ হাজার ৩৩৫টি বর্জ্য ফেলার কেন্দ্রের সন্ধান পাওয়া যায়।গবেষণার এসব তথ্য উড়োজাহাজ চলাচলের এলাকার আশপাশে পাখির উপস্থিতি কমাতে সমন্বিত পরিবেশ ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।পাখির আঘাত ও বন্যপ্রাণীজনিত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় সম্প্রতি একটি জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাতের নেতৃত্বে এ কমিটি কাজ করবে।নূর-ই-আলম জানান, আগামী নভেম্বর ২০২৬-এ কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।বিমানবন্দরগুলোতে বন্যপ্রাণীজনিত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা বাস্তবায়নে এ কমিটি প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।দেশব্যাপী সরঞ্জাম সংগ্রহ, জনবল নিয়োগ ও বন্যপ্রাণীজনিত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্য মোট ব্যয় এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। তবে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও পরিচালনাগত প্রস্তুতি শুরু করেছে বেবিচক।বেবিচকের সর্বশেষ বিমানবন্দরভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত দেশের বিমানবন্দরগুলোতে উড়োজাহাজের সঙ্গে পাখির সংঘর্ষের ২১২টি ঘটনা ঘটেছে। ২০২৫ সালের পুরো বছরে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছিল ২৩৯টি।চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পাখির আঘাতের ঘটনা ঘটেছে ১৬৮টি। ২০২৫ সালের পুরো বছরে এ সংখ্যা ছিল ১৫৭টি।চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে চলতি বছর ১২টি ঘটনা ঘটেছে। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৪০টি। সিলেটে চলতি বছর ৮টি এবং গত বছর ১৩টি ঘটনা ঘটে।কক্সবাজারে চলতি বছর একটি ঘটনা ঘটেছে। গত বছর ঘটেছিল ২টি। রাজশাহীতে উভয় সময়েই ১০টি করে ঘটনা ঘটেছে। সৈয়দপুরে চলতি বছর ১৩টি ঘটনা ঘটেছে, যা ২০২৫ সালে ছিল ১৭টি।যশোর ও বরিশাল বিমানবন্দরে উভয় সময়েই পাখির আঘাতের কোনো ঘটনা ঘটেনি।উড়োজাহাজের ইঞ্জিন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, ফ্লাইটের সময়সূচি ব্যাহত হওয়া এবং কখনো কখনো জরুরি অবতরণের মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে পাখির সঙ্গে সংঘর্ষ। তাই বিমান চলাচলের নিরাপত্তায় বন্যপ্রাণীজনিত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।সামনে শীত মৌসুম। এ সময় পাখির চলাচল বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকায় ঝুঁকি কমাতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রক সংস্থা। সূত্র: বাসসএটিভি/এসটিও