• ঢাকা
  • |
  • বুধবার ২৮শে শ্রাবণ ১৪৩৩ সন্ধ্যা ০৬:৫২:৪৭ (12-Aug-2026)
  • - ৩৩° সে:
স্বরূপকাঠিতে ঐতিহ্যবাহী ভাসমান নৌকারহাট, নদীপথেই জমে ওঠে বাণিজ্য

স্বরূপকাঠিতে ঐতিহ্যবাহী ভাসমান নৌকারহাট, নদীপথেই জমে ওঠে বাণিজ্য

পিরোজপুর প্রতিনিধি: পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার আটঘর-কুড়িয়ানায় শতবর্ষের ঐতিহ্য দেশের অন্যতম ব্যতিক্রমী ভাসমান নৌকার হাট। জনপদের এই জলবাজারে দেশজুড়ে ক্রেতা-বিক্রেতার মিলনমেলায় জমে ওঠে কাঠের নৌকার কেনাবেচা, যা নদীনির্ভর বাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির এক অনন্য প্রতিচ্ছবি।প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নদী, ঐতিহ্য আর গ্রামীণ সংস্কৃতির অপূর্ব সমন্বয় এ নৌকার হাট। বরিশাল, ঝালকাঠি, খুলনা, ঢাকা, বাগেরহাট, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে যেমন ক্রেতারা আসেন, তেমনি হাটের সৌন্দর্য উপভোগ করতে ভিড় করেন দেশি-বিদেশি পর্যটকরাও। তবে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ হাট থেকে সরকার ভালো রাজস্ব পেলেও, নেই পর্যটকদের জন্য টয়লেট, মানসম্মত রেস্টুরেন্ট, গেস্ট হাউস, নিরাপদ নৌঘাট কিংবা তথ্যকেন্দ্র। সরকার এগুলো সমাধানের উদ্যোগ নিলে পর্যটক বাড়বে, সরকারের রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পাবে।প্রতি বছর বৈশাখ থেকে আশ্বিন—টানা ছয় মাস, সপ্তাহের প্রতি শুক্র ও সোমবার নদীর ওপর বসে এই ব্যতিক্রমী ভাসমান নৌকার হাট। নদী ও নদীর চরের বুকে শত শত নৌকার এমন সমারোহ দেশের অন্য কোথাও খুব একটা দেখা যায় না। হাট ইজারাদার হুমাযুন বলেন, বছরে এখানে প্রায় ১২ থেকে ১৩ কোটি টাকা নৌকা কেনাবেচা হয়। সরকারের রাজস্ব কোষাগারেও জমা হয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ। এখানকার শতবর্ষের ঐতিহ্য ধরে রেখে এখনো দক্ষ কারিগরদের নিখুত হাতের তৈরি নৌকা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে জাপান, চীন, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশেও রপ্তানি হয়েছে। প্রতিবছরই বিদেশি ক্রেতারা ঐতিহ্যবাহী এসব নৌকা কিনতে এ হাটে আসেন। নৌকা ক্রাইতা লিটন বাসার বলেন, ছোট ডিঙ্গি থেকে শুরু করে মাঝারি আকারের একএকটি নৌকার দাম দুই হাজার থেকে দশ হাজার টাকা পর্যন্ত। এসব নৌকা ব্যবহার হয় পেয়ারা পরিবহন বা পেয়ারা পাড়া, কৃষিকাজ, মাছ ধরা, গরুর গাস কাটাসহ গ্রামীণ নিত্যপ্রয়োজনীয় ও খাল-বিল অঞ্চলে যাতায়াতে। স্থানীয়দের দাবি, এ ভাসমান নৌকার হাটটি পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলা হলে এটি দেশের অন্যতম দর্শনীয় পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হতে পারে।নৌকা তৈরি ও কেনা-বেচায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ২০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে, সরকার উদ্যোগে নিলে এটি দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা।নৌকা ব্যাবসায়ীরা বলেন, "আমাদের নৌকার চাহিদা অনেক। কিন্তু অবকাঠামোর অভাবে অনেক ক্রেতা ফিরে যান। সরকার যদি এই হাটকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে উন্নয়ন করে, তাহলে আমাদের বিক্রি বাড়বে, নতুন কর্মসংস্থান হবে এবং তরুণরাও এই পেশায় আগ্রহী হবে”।" এগুলোকে বলা হয় ছোট ডিঙ্গি। এখানকার নৌকার মান খুব ভালো। দামও তুলনামূলকভাবে কম। "সারি সারি জলপথনির্ভর এই ব্যতিক্রমী বাজার শুধু স্থানীয় অর্থনীতিকেই গতিশীল করছে না, বরং বহন করছে বাংলার শতবর্ষী ঐতিহ্যের গৌরবও।প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর লোকজ সংস্কৃতির মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এই ভাসমান হাট এখন পর্যটকদের কাছেও এক অনন্য আকর্ষণের নাম।,” যথাযথ সংরক্ষণ ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এটি আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রেও বাংলাদেশের এক উজ্জ্বল ঐতিহ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে পারে। পর্যটক শামীমা বলেন "এমন একটি ঐতিহ্যবাহী ভাসমান হাট সত্যিই অসাধারণ।কিন্তু পর্যটকদের জন্য সুযোগ-সুবিধা খুবই সীমিত। সরকার যদি পরিকল্পিতভাবে এটি উন্নয়ন করে, তাহলে দেশ-বিদেশ থেকে আরও অনেক পর্যটক এখানে আসবেন। এতে স্থানীয় মানুষের আয়ও বাড়বে।" স্থানীয়দের দাবি, পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলা হলে এটি দেশের অন্যতম দর্শনীয় পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হতে পারে।প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহ্য, কারিগরি দক্ষতা এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনা—সব মিলিয়ে আটঘর-কুড়িয়ানার ভাসমান নৌকার হাট হতে পারে বাংলাদেশের নদীকেন্দ্রিক পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ। শত বছরের ইতিহাসকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে থাকা এই হাট এখন শুধু উন্নয়নের ছোঁয়ার অপেক্ষায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঐতিহ্য সংরক্ষণ, পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক প্রচারণার মাধ্যমে আটঘর-কুড়িয়ানার ভাসমান নৌকার হাট দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি ও পর্যটনের অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে।