জামালপুরে সাত দিনে ৫ মরদেহ উদ্ধার, বাড়ছে আতঙ্ক
জামালপুর প্রতিনিধি: মাত্র সাত দিনের ব্যবধানে জামালপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় জেলাজুড়ে উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন এক কলেজছাত্রী, দুই গৃহবধূ, এক কিশোরী ও এক ব্যবসায়ী।ঘটনাগুলোর পেছনের কারণ এক নয়। কোথাও হত্যার অভিযোগ রয়েছে, কোথাও মিলেছে আত্মহত্যার আলামত, আবার কোনো কোনো মৃত্যুর কারণ এখনো রহস্যাবৃত। তবে অল্প সময়ের মধ্যে একের পর এক মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।গত ২৩ আগস্ট জামালপুর শহরের শেখের ভিটা এলাকার একটি বাসা থেকে ইশরাত জাহান মিমি নামে এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে নিহতের পরিবারের দায়ের করা হত্যা মামলার তদন্তে নামে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।তদন্তের একপর্যায়ে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পিবিআইয়ের দাবি, গ্রেপ্তার আসামি আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। ঘটনাটি জেলাজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।এর চার দিন পর, ২৭ আগস্ট মাদারগঞ্জ উপজেলার একটি ভাঙারি দোকান থেকে সামিউল ইসলাম নামে এক ব্যবসায়ীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। পুলিশ ঘটনাটি তদন্ত করছে।পরদিন ২৮ আগস্ট সকালে মাদারগঞ্জ উপজেলার চরপাকেরদহ ইউনিয়নের একটি সেচপাম্প ঘর থেকে রূপসী আক্তার (১৬) নামে এক কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আগের রাত থেকে নিখোঁজ থাকা ওই কিশোরীর মৃত্যু নিয়েও এলাকায় নানা আলোচনা চলছে। তবে পুলিশ জানিয়েছে, তদন্ত ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার আগে মৃত্যুর কারণ নিয়ে মন্তব্য করা সম্ভব নয়।একই দিন রাতে জামালপুর শহরের দক্ষিণ কাচারীপাড়া এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ইসরাত জাহান রিমার (২৫) ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। কয়েকদিন ধরে তার কক্ষ বন্ধ থাকায় এবং ভেতর থেকে দুর্গন্ধ বের হলে প্রতিবেশীরা পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দরজা ভেঙে মরদেহ উদ্ধার করেন।সবশেষ ২৯ আগস্ট শনিবার সকালে নান্দিনা রেলস্টেশন সংলগ্ন একটি বাসা থেকে শারমিন আক্তার (২৬) নামে এক গৃহবধূর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনাটিও তদন্ত করছে পুলিশ।স্বল্প সময়ের মধ্যে একের পর এক মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের দাবি, প্রতিটি ঘটনার দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটন করা জরুরি।জামালপুর শহরের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, এক সপ্তাহে পাঁচটি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে অস্বস্তি ও শঙ্কা তৈরি করেছে। প্রতিটি ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন করতে হবে। পাশাপাশি মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি।জামালপুরের সিভিল সার্জন ডা. মো. আজিজুল হক বলেন, আত্মহত্যা, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা ও মাদকাসক্তির মতো বিষয়গুলো প্রতিরোধে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। এসব বিষয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, আলোচিত পাঁচটি ঘটনার মধ্যে কোনো সরাসরি যোগসূত্র নেই। প্রতিটি ঘটনার ধরন ও প্রেক্ষাপট আলাদা। তদন্ত এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।জামালপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) ইয়াহিয়া আল মামুন বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে উদ্ধার হওয়া প্রতিটি মরদেহের ঘটনাই গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। যেসব ঘটনায় অপরাধমূলক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোর রহস্য উদঘাটনে পুলিশ কাজ করছে। পাশাপাশি বিট পুলিশিং কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।মাত্র সাত দিনের ব্যবধানে পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা এখন জামালপুরবাসীর আলোচনার অন্যতম বিষয়। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো ঘটনাকে ঘিরে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে না পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে মানুষের একটাই দাবি, দ্রুত তদন্ত শেষ করে প্রতিটি মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটন করা হোক।