• ঢাকা
  • |
  • শনিবার ২৫শে আশ্বিন ১৪৩৩ সকাল ১০:৪৩:৩৭ (10-Oct-2026)
  • - ৩৩° সে:
শিশুদের ছবি আঁকার স্বপ্ন বাঁচিয়ে রেখেছে এস এম সুলতানের শিশুস্বর্গ

শিশুদের ছবি আঁকার স্বপ্ন বাঁচিয়ে রেখেছে এস এম সুলতানের শিশুস্বর্গ

ডেস্ক রিপোর্ট: বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের ৩২তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ ১০ অক্টোবর। ১৯৯৪ সালের এই দিনে অসুস্থতাজনিত কারণে যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। পরে নড়াইলে চিত্রা নদীর পাড়ে তাঁর নিজ বাসভবনের উত্তর পাশে সমাহিত করা হয় এই কিংবদন্তি শিল্পীকে।মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে এস এম সুলতান ফাউন্ডেশন ও জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে পবিত্র কোরআন খতম, শিল্পীর সমাধিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন, দোয়া ও মোনাজাত, শিশু-কিশোরদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, আলোচনা সভা এবং পুরস্কার বিতরণ।১৯২৪ সালের ১০ আগস্ট নড়াইল শহরের মাছিমদিয়ায় এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এস এম সুলতান। তাঁর বাবা মেছের আলী ও মা মাজু বিবি আদর করে নাম রেখেছিলেন লাল মিয়া। পরিবারের আর্থিক অনটনের কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় বেশি দূর এগোতে পারেননি তিনি। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার পরই তাঁর স্কুলজীবনের ইতি ঘটে। এরপর বাবার সঙ্গে রাজমিস্ত্রির কাজ শুরু করেন। তবে ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকার প্রতি ছিল তাঁর গভীর আগ্রহ। বাবার সঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি দালানকোঠার ছবি আঁকতেন তিনি।১৯৩৮ সালে কলকাতার আর্ট স্কুলে ভর্তি হন এস এম সুলতান। সেখানে প্রায় তিন বছর চিত্রকলার ওপর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরে পড়াশোনা অসমাপ্ত রেখেই বেরিয়ে পড়েন দেশ-বিদেশ ভ্রমণে। পাকিস্তান, কাশ্মীর, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ঘুরে বেড়ান তিনি। ভ্রমণ, অভিজ্ঞতা ও নিরন্তর শিল্পসাধনার মধ্য দিয়ে নিজস্ব চিত্রভাষা গড়ে তোলেন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পরিচিতি লাভ করেন।জীবদ্দশায় বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে তাঁর চিত্রকর্ম প্রদর্শিত হয়েছে। ১৯৪৬ থেকে ১৯৫১ সালের মধ্যে বিভিন্ন দেশে একক ও যৌথ প্রদর্শনীতে অংশ নেন তিনি। দেশের মধ্যে ঢাকা ও নড়াইলেও তাঁর চিত্রকর্মের প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি এবং ১৯৮৭ সালে গ্যেটে ইনস্টিটিউটে আয়োজিত প্রদর্শনী তাঁর শিল্পকর্মের পরিচিতি বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।এস এম সুলতানের চিত্রকর্মের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল গ্রামীণ জীবন, কৃষকের সংগ্রাম এবং পেশিবহুল, শক্তিশালী কৃষকসমাজের প্রতিচ্ছবি। তাঁর ক্যানভাসে কৃষক শুধু শ্রমজীবী মানুষ নন, বরং শক্তি, সম্ভাবনা ও আত্মমর্যাদার প্রতীক। তাঁর উল্লেখযোগ্য চিত্রকর্মের মধ্যে রয়েছে ‘চর দখল’, ‘ধান কাটা’, ‘পাট কাটা’, ‘কৃষকের সংগ্রাম’ ও ‘আমার গ্রাম’।চিত্রকলায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮২ সালে একুশে পদক এবং ১৯৯৩ সালে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত হন এস এম সুলতান। এ ছাড়া দেশ-বিদেশে বিভিন্ন সম্মাননা অর্জন করেন তিনি।১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর তাঁর মৃত্যুর পর শিল্পীর স্মৃতি ও শিল্পকর্ম সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০০৩ সালে প্রায় এক একর জমির ওপর গড়ে তোলা হয় এস এম সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালা ও শিশুস্বর্গ। এ ছাড়া তাঁর নামে প্রতিষ্ঠা করা হয় একটি আর্ট কলেজ।শিশুস্বর্গে বর্তমানে সপ্তাহে দুই দিন শিশুদের ছবি আঁকা শেখানো হয়। শিল্পীর মতো চিত্রশিল্পী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে সেখানে ছবি আঁকার চর্চা করছে শিশুরা। তাঁদের শিল্পচর্চার সুযোগ করে দিতে পেরে সন্তুষ্ট সংশ্লিষ্ট শিক্ষকেরাও।এস এম সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত রয়েছে শিল্পীর আঁকা দুর্লভ চিত্রকর্ম এবং তাঁর ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিসপত্র। এসব নিদর্শন দেখতে ও শিল্পীর জীবন সম্পর্কে জানতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নড়াইলে আসেন দর্শনার্থীরা। চিত্রা নদীর পাড়ের সবুজ-শ্যামল পরিবেশও তাঁদের আকৃষ্ট করে।তবে সংগ্রহশালার আয়তন ও প্রদর্শনীর পরিসর সীমিত হওয়ায় অনেক দর্শনার্থীই প্রত্যাশা অনুযায়ী শিল্পীর চিত্রকর্ম দেখতে পারেন না। এ কারণে আশপাশের জমি অধিগ্রহণ করে সংগ্রহশালাটিকে পূর্ণাঙ্গ পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত করার দাবি জানিয়েছেন দর্শনার্থীরা।এস এম সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালার কিউরেটর তন্দ্রা মুখার্জী জানান, বর্তমানে সংগ্রহশালায় শিল্পীর ২৩টি দুর্লভ চিত্রকর্ম এবং ৫৩টি প্রতিরূপ সংরক্ষিত রয়েছে। শিল্পীর আরও চিত্রকর্ম থাকলেও জায়গার অভাবে সেগুলো প্রদর্শন করা সম্ভব হচ্ছে না।তিনি জানান, সংগ্রহশালার পরিসর বাড়াতে জমি অধিগ্রহণের একটি প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদিত হলে সংগ্রহশালার আয়তন বাড়বে এবং দর্শনার্থীদের জন্য আরও উন্নত পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।সূত্র: দেশ রূপান্তর