দুপুরের খাবারের পর ঘুমভাব, শরীরে যে পরিবর্তনের ইঙ্গিত
লাইফস্টাইল ডেস্ক: দুপুরে পেট ভরে খাওয়ার পর অনেকেরই চোখে ঘুম নেমে আসে। কাজের ব্যস্ততার মাঝেও শরীর কিছুটা নিস্তেজ লাগে, মনোযোগ কমে যায় এবং বিশ্রাম নেওয়ার ইচ্ছা তৈরি হয়। এই ঘুমভাবকে অনেক সময় খাবারের পর স্বাভাবিক শারীরিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু খাবার খাওয়ার পর এমন ঘুম ঘুম ভাব তৈরি হয় কেন?বিশেষজ্ঞদের মতে, খাবার হজমের প্রক্রিয়ায় শরীরে বিভিন্ন ধরনের হরমোন ও রাসায়নিকের কার্যক্রমে পরিবর্তন ঘটে। খাবার গ্রহণের পর রক্তে গ্লুকোজ ও ইনসুলিনের মাত্রায় পরিবর্তন আসে। একই সঙ্গে মস্তিষ্কে ঘুম ও জাগরণের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু রাসায়নিকের কার্যক্রমেও প্রভাব পড়ে। এসব কারণে শরীরে সাময়িক ঘুমভাব দেখা দিতে পারে।সাধারণত খাবার খাওয়ার এক থেকে দুই ঘণ্টা পর এই তন্দ্রাভাব বেশি দেখা যায়, বিশেষ করে খাবার পরিমাণে বেশি হলে। তবে শুধু খাবারের পরিমাণই দায়ী নয়। রাতে পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া, শরীরের সার্কাডিয়ান ছন্দ, অ্যালকোহল, পানিশূন্যতা এবং ঘুমভাব তৈরি করে এমন কিছু ওষুধও এই পরিস্থিতিকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।এছাড়াও অতিরিক্ত পরিমাণে খাবার খাওয়া, বেশি পরিমাণে পরিশোধিত শর্করা বা চিনি গ্রহণ করলে খাবারের পর ক্লান্তি ও ঘুমভাব তুলনামূলক বেশি অনুভূত হতে পারে। অন্যদিকে সুষম খাবার, পর্যাপ্ত পানি পান এবং পরিমিত খাবার গ্রহণ করলে খাবারের পর অতিরিক্ত ঝিমুনি কিছুটা কমতে পারে।খাবারের পর সামান্য হাঁটাচলা করাও উপকারি হতে পারে। এতে শরীর সক্রিয় থাকে এবং দীর্ঘ সময় বসে থাকার কারণে যে অলসতা তৈরি হয়, তা কমাতে সাহায্য করে।তবে প্রতিদিন দুপুরের খাবারের পর অতিরিক্ত ঘুমভাব দেখা দিলে বা এর সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি, দুর্বলতা কিংবা অন্য কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গ থাকলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। এমন ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।রক্তে শর্করার ওঠানামাবিশেষজ্ঞদের মতে, খাবারের পর ঘুম ঘুম ভাবের ক্ষেত্রে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট বেশি থাকা খাবার খেলে শরীরে দ্রুত গ্লুকোজ বেড়ে যেতে পারে। এরপর ইনসুলিনের প্রভাবে গ্লুকোজের মাত্রা দ্রুত কমে গেলে অতিরিক্ত ঘুমভাব তৈরি হতে পারে। এই ঘটনাকে ‘রিঅ্যাকটিভ হাইপোগ্লাইসেমিয়া’ বলা হয়।সাদা ভাত, পেস্ট্রি ও চিনিযুক্ত পানীয়ের মতো পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট ও চিনি বেশি থাকা খাবারে রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়া ও কমার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে, অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার পাকস্থলী থেকে খাবার বের হওয়ার প্রক্রিয়া ধীর করে দিতে পারে এবং বিপাকীয় কার্যক্রম বাড়াতে পারে। আবার বেশি পরিমাণ প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার ট্রিপটোফ্যান উৎপাদন বাড়াতে পারে, যা মেলাটোনিন ও সেরোটোনিন তৈরিতে সহায়তা করে।দুপুরে খাওয়ার পর যেভাবে সতেজ থাকা যায়দীর্ঘসময় সতর্ক ও কর্মক্ষম থাকতে খাবারে শস্য, প্রোটিন ও চর্বির পরিমিত সমন্বয় রাখা যেতে পারে। তবে শুধু খাবারের পর ঘুম ঘুম ভাব হলেই সেটিকে হাইপোগ্লাইসেমিয়া বা ডায়াবেটিসের লক্ষণ হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়। এ ধরনের বিষয় নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পরীক্ষা করা দরকার।বিশেষজ্ঞের মতে, বড় খাবারের পর কিছুটা ক্লান্তি বা তন্দ্রাভাব সাধারণ ঘটনা। কিন্তু প্রতিবার খাবার খাওয়ার পর, খাবারের পরিমাণ যাই হোক না কেন, যদি তীব্র ক্লান্তি দেখা দেয় এবং এর সঙ্গে অতিরিক্ত তৃষ্ণা, অস্বাভাবিক ওজন বাড়া বা কমা, ঝাপসা দেখা কিংবা মনোযোগ ধরে রাখতে না পারার মতো সমস্যা থাকে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।এ ধরনের উপসর্গের পেছনে ইনসুলিন প্রতিরোধ বা টাইপ-২ ডায়াবেটিসের মতো সমস্যা থাকতে পারে। আবার থাইরয়েডের কার্যকারিতায় সমস্যা কিংবা শনাক্ত না হওয়া ঘুমের সমস্যাও খাবারের পর অতিরিক্ত ক্লান্তির কারণ হতে পারে।