‘আমরা এখন কোথায় যাব, গরিবদের দেখার কী কেউ নেই?’
অনলাইন ডেস্ক: সড়কের পাশে পুরনো তক্তার বেড়া। তার আড়ালে ইট-কাঠের ওপর তক্তা বিছিয়ে তৈরি কোনোরকম পাটাতন।পাটাতনের ওপর পাতা খেজুরপাতার পাটি। তার ওপর খেলা করছিল বছর পাঁচেকের একটি শিশু। পাশে গৃহস্থালী কাজ করছিলেন শিশুটির দাদি কমলা খাতুন।কমলা খাতুন কুড়িগ্রামের রৌমারীর দাঁতভাঙ্গা ইউনিয়নের ছোট কাউনিয়ার চর এলাকার সাহেব আলীর স্ত্রী।সপ্তাহ খানেক আগে ছেলে, ছেলের বউসহ, তাদের শিশু সন্তানসহ ১২ সদস্যের পরিবার নিয়ে তারা আশ্রয় নিয়েছেন সড়কের পাশে।এর আগে ১৮ বছর ধরে যে ভিটায় পরিবার নিয়ে বাস করছিলেন সাহেব আলী, আদালতের রায়ের পর সেটি এখন ধ্বংসস্তূপ। তাই উপায়ন্তর না থাকায় সড়কের পাশেই এখন তাদের ঠিকানা। সেখানে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন তারা।পরিবারটির দাবি, ক্রয়সূত্রে পাওয়া জমিতে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করলেও আদালতের রায় দেখিয়ে স্থানীয় কয়েকজন লোক তাদের উচ্ছেদ করেছেন।৩১ জুলাই শুক্রবার কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার দাঁতভাঙ্গা ইউনিয়নের ছোট কাউনিয়ারচরের শালুর মোড় এলাকা থেকে সাহেব আলীর পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়। বাড়ি ভেঙে ফেলার পর ঘরের ধ্বংসাবশেষ পাশের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে ফেলে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ পরিবারটির।৪ আগস্ট মঙ্গলবার সরেজমিন সংশ্লিষ্ট এলাকায় গেলে কান্নায় ভেঙে পড়েন কমলা খাতুন। বলেন, ‘আমাদের থাকার জায়গা থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। বিছানা, রান্নাঘর, টয়লেট- সবকিছু রেখে বের হয়ে এসেছি। এখন আমরা কোথায় যাব?‘নতুন আশ্রয়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে কমলা খাতুন বলেন, ‘খোলা আকাশের নিচে বৃষ্টিতে সবকিছু ভিজে যায়, রোদে পুড়তে হয়। বাথরুমে যাওয়ার দরকার হলে বিপদে পড়তে হয়। সাথে ছোট ছোট বাচ্চা। রাস্তার ওপর তো আর বাস করা যায় না।’ নিয়তির কাছে বার বার প্রশ্ন ছুড়ে দেন কমলা খাতুন, ‘আমরা এখন কোথায় যাব, কী খাব? গরিব মানুষদের দেখার কী কেউ নেই?’পরিবার ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০০৮ সালের কথা। প্রথমে ছোট কাউনিয়ার চরের শালুর মোড় এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দা নুর ভানুর কাছ থেকে এবং পরে ২০১২ সালে জলিল মাস্টারের ছেলে মুকুল ও মেয়ে লাইজুর কাছ থেকে নিবন্ধিত কবলা দলিলের মাধ্যমে ৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ জমি কেনেন সাহেব আলী। এরপর সেখানে বসতঘর নির্মাণ করে পরিবার নিয়ে বসবাস করে আসছিলেন।সাহেব আলীর ভাষ্য, ‘দুইটি নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে জমি কিনে প্রায় ১৮ বছর ধরে বসবাস করছিলাম। এখন ঘরবাড়ি ভেঙে আমাদের পথে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমার অন্য কোথাও এক ইঞ্চি জমিও নেই। তাই স্ত্রী-সন্তান নিয়ে রাস্তায় থাকতে হচ্ছে। এতে প্রায় ১৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।’মিন্টু মিয়াসহ কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সাহেব আলী ওই জমিতে বসবাস করছিলেন। হঠাৎ আদালতের রায়ের ভিত্তিতে তাদের ঘর উচ্ছেদ করা হয়। এতে চরম বিপদে পড়ে পরিবারটি।দাঁতভাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মিজানুর রহমান বলেন, ‘উভয় পক্ষকে নিয়ে বিষয়টি স্থানীয়ভাবে সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু পরে আদালতের রায়ের ভিত্তিতে উচ্ছেদ করা হয়েছে। এখন পরিবারটি খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাচ্ছে। মানবিক দিক বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।’উচ্ছেদের বিষয়ে অভিযুক্ত আব্দুর রহমানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তা ধরেননি তিনি।এদিকে, ঘটনাটি এলাকায় আলোচনা সৃষ্টি করেছে। স্থানীয়দের দাবি, আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি উচ্ছেদ হওয়া পরিবারটির মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের উদ্যোগ জরুরি।সূত্র: কালের কণ্ঠ