• ঢাকা
  • |
  • শনিবার ২৮শে ভাদ্র ১৪৩৩ রাত ১১:০০:৩৯ (12-Sep-2026)
  • - ৩৩° সে:
তালপাতার পাখার চাহিদা বাড়লেও লোকসানে কারিগর

তালপাতার পাখার চাহিদা বাড়লেও লোকসানে কারিগর

ময়মনসিংহ প্রতিনিধি: তীব্র গরম আর অসহনীয় লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ জনজীবন। বিদ্যুৎ চলে গেলেই স্বস্তির জন্য অনেকের হাতেই উঠছে তালপাতার হাতপাখা। এতে একসময় হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যবাহী এই কুটিরশিল্পে আবারও বেড়েছে চাহিদা। তবে চাহিদা বাড়লেও ভালো নেই কারিগররা। কাঁচামালের সংকট, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, প্লাস্টিকের পাখার সঙ্গে প্রতিযোগিতা ও কম বিক্রি মূল্যের কারণে লোকসান গুনছেন তারা।ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলার বিদ্যানন্দ গ্রামে গেলে দেখা যায়, বাড়ির উঠানজুড়ে হাতপাখা তৈরির ব্যস্ততা। গ্রামের প্রায় আড়াইশ পরিবার কোনো না কোনোভাবে এই পেশার সঙ্গে জড়িত। পরিবারের নারী-পুরুষ মিলে তৈরি করছেন তালপাতার পাখা।স্থানীয় কারিগর রফিকুল ইসলাম বলেন, “এবার গরম অনেক বেশি। বিদ্যুৎ চলে গেলে মানুষ হাতপাখা কিনতে আসছেন। আগের তুলনায় চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু পাতা, বাঁশ ও সুতার দাম বেড়ে যাওয়ায় আমাদের লাভ তেমন হচ্ছে না।”আরেক কারিগর আব্দুল হালিম বলেন, “বাপ-দাদার আমল থেকে এই কাজ করে আসছি। পাখা বানাতে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি খরচ হয়। কিন্তু বাজারে বেশি দাম চাইলে ক্রেতারা নিতে চান না। ফলে অনেক সময় শ্রমের দামই উঠে আসে না।”কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তালপাতা সংগ্রহ করাও দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। তালগাছ কমে যাওয়ায় অনেক সময় দূরের এলাকা থেকে পাতা সংগ্রহ করতে হয়। এতে কাঁচামালের পাশাপাশি পরিবহন খরচও বাড়ছে।স্থানীয় নারী কারিগর রহিমা বেগম বলেন, “সংসারের কাজের পাশাপাশি আমরা পাখা তৈরি করি। গরমের সময় কাজ অনেক বেড়ে যায়। কিন্তু বছরের অন্য সময় তেমন কাজ থাকে না। সহজ শর্তে ঋণ পেলে কাঁচামাল কিনে বেশি পাখা তৈরি করতে পারতাম।”আরেক কারিগর মো. জয়নাল মিয়া বলেন, “আমাদের পাখা ময়মনসিংহের বাইরে নারায়ণগঞ্জ, বগুড়া, সিলেট ও ঢাকাতেও যায়। বাজার আরও বড় করা গেলে আমরা বেশি পাখা বানাতে পারতাম। সরকার যদি ঋণ আর বাজারজাতকরণে সহযোগিতা করে, তাহলে এই পেশা ধরে রাখা সহজ হবে।”তালপাতা, বাঁশের কঞ্চি ও সুতা দিয়ে তৈরি হয় এসব হাতপাখা। প্রথমে তালগাছ থেকে পাতা সংগ্রহ করে কয়েক ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়। এরপর রোদে শুকিয়ে পাখার আকৃতিতে কেটে সুতা দিয়ে বাঁধাই করা হয়। সবশেষে হাতলে রং করে বাজারজাত করা হয়।তবে প্লাস্টিকের তৈরি পাখার ব্যবহার, তালপাতার সংকট ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির কারণে ঐতিহ্যবাহী এই পেশা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। কারিগরদের দাবি, সহজ শর্তে ক্ষুদ্র ঋণ, কাঁচামাল সংগ্রহে সহায়তা এবং বাজার সম্প্রসারণের ব্যবস্থা করা গেলে এই শিল্পে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।ফুলবাড়ীয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শহীদুল ইসলাম সোহাগ বলেন, হাতপাখা তৈরির সঙ্গে জড়িত উদ্যোক্তাদের ঋণ সুবিধা এবং এ অঞ্চলের তৈরি হাতপাখার বাজার সম্প্রসারণে উদ্যোগ নেওয়া হবে।কারিগরদের ভাষ্য, গরম ও লোডশেডিংয়ের কারণে তালপাতার পাখার চাহিদা বাড়লেও এই বাড়তি চাহিদা তাদের আর্থিক সংকট কাটাতে পারছে না। কারণ উৎপাদন খরচের তুলনায় বিক্রি মূল্য কম।একসময় আধুনিক বৈদ্যুতিক পাখার দাপটে হারিয়ে যেতে বসেছিল তালপাতার হাতপাখা। এখন বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সেই পাখাই আবার মানুষের ঘরে ফিরেছে। তবে চাহিদার এই নতুন সুযোগকে টেকসই আয়ে রূপ দিতে না পারলে গরমের মৌসুম শেষে আবারও অনিশ্চয়তায় পড়বেন এই কুটিরশিল্পের কারিগররা।বিদ্যানন্দ গ্রামের তৈরি তালপাতার হাতপাখা মৌসুমে নারায়ণগঞ্জ, বগুড়া, সিলেট, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বড় শহরে সরবরাহ করা হয়।