• ঢাকা
  • |
  • বৃহঃস্পতিবার ২৩শে আশ্বিন ১৪৩৩ সকাল ১০:৩৪:৪৪ (08-Oct-2026)
  • - ৩৩° সে:
হিথ্রোকে পেছনে ফেলে বিশ্বের সেরা বিমানবন্দর এখন ইস্তাম্বুল

হিথ্রোকে পেছনে ফেলে বিশ্বের সেরা বিমানবন্দর এখন ইস্তাম্বুল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: দুই মহাদেশের সংযোগস্থলে অবস্থানের কারণে তুরস্কের ইস্তাম্বুল বহু শতাব্দী ধরে বৈশ্বিক যোগাযোগ ও বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এবার আকাশপথের যোগাযোগেও সেই ঐতিহাসিক গুরুত্বের নতুন প্রতিফলন দেখা গেল। লন্ডনের হিথ্রোকে পেছনে ফেলে বিশ্বের সবচেয়ে ভালো সংযুক্ত বিমানবন্দরের স্বীকৃতি পেয়েছে ইস্তাম্বুল বিমানবন্দর।বৈশ্বিক ভ্রমণ তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ওএজির ২০২৬ সালের ‘মেগাহাবস ইনডেক্স’-এ শীর্ষস্থান দখল করেছে আইজিএ ইস্তাম্বুল বিমানবন্দর। বিশ্বের বড় বিমানবন্দরগুলোর আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের নির্ধারিত সংযোগ এবং সেখান থেকে পৌঁছানো যায় এমন গন্তব্যের সংখ্যা বিবেচনা করে এই সূচক তৈরি করা হয়েছে। এ বছরের ব্যস্ততম দিনের তথ্য হিসেবে ২ আগস্টের কার্যক্রম বিশ্লেষণে নেওয়া হয়।ওএজির প্রধান বিশ্লেষক জন গ্রান্ট বলেন, ইস্তাম্বুল বিমানবন্দর শেষ পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে ভালো সংযুক্ত বিমানবন্দরের অবস্থান অর্জন করেছে। আগামী বছরগুলোতে বিমানবন্দরটির অবস্থান আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও মনে করেন তিনি।আইজিএ ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সেলাহাত্তিন বিলগেন বলেন, বিশ্বের শীর্ষ সংযুক্ত বিমানবন্দর হওয়া তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। বর্তমানে বিমানবন্দরটি বিশ্বের প্রায় ৩৫০টি গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। ভবিষ্যতে এর পরিধি আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।২০২৬ সালের সূচকে ইস্তাম্বুলের পর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে লন্ডন হিথ্রো। তৃতীয় আমস্টারডাম শিফল, চতুর্থ কুয়ালালামপুর এবং পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে শিকাগো ওহেয়ার বিমানবন্দর।২০১৮ সালে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ইস্তাম্বুলের ইউরোপীয় অংশে বিমানবন্দরটি চালু হয়। শহর থেকে প্রায় ২০ মাইল দূরে নির্মিত এই বিশাল স্থাপনাটি শুরু থেকেই বড় পরিসরে সম্প্রসারণের লক্ষ্য নিয়ে তৈরি করা হয়েছে। এর টার্মিনালের আয়তন প্রায় ১৪ লাখ বর্গমিটার, যা এক ছাদের নিচে বিশ্বের সবচেয়ে বড় টার্মিনালগুলোর একটি। পুরো বিমানবন্দর এলাকার আয়তন প্রায় ৭ কোটি ৬৫ লাখ বর্গমিটার—যা নিউইয়র্কের ম্যানহাটন দ্বীপের চেয়েও বড়।প্রতি বছর ৮ কোটি ৪০ লাখের বেশি যাত্রী এই বিমানবন্দর ব্যবহার করেন। বর্তমানে এটি বিশ্বের অষ্টম ব্যস্ততম বিমানবন্দর। তবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় বছরে ২০ কোটি যাত্রী সামলানোর সক্ষমতা গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে। এই সংখ্যা বর্তমানে বিশ্বের ব্যস্ততম বিমানবন্দর আটলান্টার হার্টসফিল্ড-জ্যাকসনের বার্ষিক যাত্রীসংখ্যার প্রায় দ্বিগুণ।বিমানবন্দরটির সম্প্রসারণ পরিকল্পনায় রানওয়েও গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি চতুর্থ প্রধান রানওয়ে চালু হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ছয়টি প্রধান ও তিনটি রিজার্ভ—মোট নয়টি রানওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।নতুন রানওয়েটির দৈর্ঘ্য ২ হাজার ৮২০ মিটার। এটি বিমানবন্দরটির প্রথম পূর্ব-পশ্চিমমুখী রানওয়ে। এর ফলে পশ্চিমমুখী উড়োজাহাজের ভূমিতে চলাচল ও আকাশপথের সময় কমবে, পাশাপাশি জ্বালানি সাশ্রয় হবে বলে আশা করা হচ্ছে।গ্রান্টের মতে, একই সময়ে তিনটি রানওয়ে ব্যবহারের অনুমোদন থাকা বিশ্বের একমাত্র বিমানবন্দর ইস্তাম্বুল। এতে ব্যস্ত সময়ে ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি পরিচালনায় বাড়তি নমনীয়তা পাওয়া যায় এবং সময়মতো ফ্লাইট পরিচালনার সক্ষমতাও বাড়ে।ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরের সাফল্যের পেছনে বড় ভূমিকা রয়েছে টার্কিশ এয়ারলাইনসের। বিমানবন্দরটির প্রায় ৮০ শতাংশ ফ্লাইট এই বিমান সংস্থার। ২০২৬ সাল পর্যন্ত বিশ্বের অন্য যেকোনো বিমান সংস্থার তুলনায় সবচেয়ে বেশি—১৩০টি দেশে—ফ্লাইট পরিচালনার রেকর্ডও রয়েছে তাদের। সংস্থাটির বহরে ৫০০টির বেশি বোয়িং ও এয়ারবাস উড়োজাহাজ রয়েছে।আধুনিক ও তুলনামূলক নতুন উড়োজাহাজ ব্যবহারের ফলে যাত্রীসেবার মান বাড়ার পাশাপাশি জ্বালানি খরচ কমছে। এতে জ্বালানির উচ্চমূল্যের সময়েও টিকিটের দাম প্রতিযোগিতামূলক রাখার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।ব্রিটেনের ক্র্যানফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিমান পরিবহন ব্যবস্থাপনার জ্যেষ্ঠ প্রভাষক ভিক্টোরিয়া মাইরোনিউক বলেন, আধুনিক উড়োজাহাজ যাত্রীদের জন্য ভালো ভ্রমণ অভিজ্ঞতা তৈরি করে। টার্কিশ এয়ারলাইনস সম্প্রতি ইউরোপের সেরা বিমান সংস্থার পুরস্কারও পেয়েছে।ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরের ভৌগোলিক অবস্থান ও অবকাঠামোও এর সংযোগ সক্ষমতা বাড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন বিমানবন্দর ও বিমান চলাচল নেটওয়ার্কে পরিবর্তন এসেছে। এ পরিস্থিতিতে তুরস্কের ভৌগোলিক অবস্থান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ইস্তাম্বুলকে বাড়তি সুবিধা দিয়েছে।অন্যদিকে লন্ডন হিথ্রোর তৃতীয় রানওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কের মধ্যে রয়েছে। আমস্টারডাম শিফলও বছরে ৪ লাখ ৮৮ হাজার ফ্লাইটের সীমার মধ্যে রয়েছে। ইস্তাম্বুল বিমানবন্দর শহরের কিছুটা বাইরে হওয়ায় সেখানে ২৪ ঘণ্টা কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব।টার্কিশ এয়ারলাইনসের ‘স্টপওভার’ কর্মসূচিও বিমানবন্দরটির আকর্ষণ বাড়িয়েছে। দীর্ঘ ট্রানজিটের যাত্রীরা চাইলে ইস্তাম্বুলে অবস্থান করে শহর ঘুরে দেখতে পারেন। বিশেষ ক্ষেত্রে তাদের জন্য বিনামূল্যে হোটেলে থাকার সুবিধাও দেওয়া হয়।বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের সুবিধা যাত্রীদের শুধু দ্রুত সংযোগ বদলের পরিবর্তে স্থানীয় সংস্কৃতি ও শহরকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ করে দেয়। ফলে ইস্তাম্বুল বিমানবন্দর শুধু ট্রানজিট কেন্দ্র নয়, পর্যটনেরও গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বারে পরিণত হচ্ছে।গ্রান্ট মনে করেন, আগামী বছরগুলোতেও ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরের শীর্ষ অবস্থান ধরে রাখার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আগামী তিন থেকে চার বছরে চীনের বিমানবন্দরগুলো আন্তর্জাতিক সংযোগের ক্ষেত্রে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে। দেশটির বিমান সংস্থাগুলোর আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণ বাড়লে বড় বিমানবন্দরগুলোও মেগাহাব তালিকায় আরও ওপরে উঠতে পারে।একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিমান চলাচল স্বাভাবিক হলে ওই অঞ্চলের বিমানবন্দরগুলোও আবার শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। তবে ইউরোপের হিথ্রো, শিফল ও প্যারিসের মতো বড় বিমানবন্দরগুলোর সক্ষমতা সীমার কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ায় ইস্তাম্বুলের জন্য প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা ধরে রাখার সুযোগ রয়েছে।সূত্র: সিএনএন