• ঢাকা
  • |
  • বৃহঃস্পতিবার ৫ই ভাদ্র ১৪৩৩ দুপুর ১২:১৯:৫৫ (20-Aug-2026)
  • - ৩৩° সে:
ময়মনসিংহে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ১৪৭ বছরের আলেকজান্দ্রা ক্যাসেল

ময়মনসিংহে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ১৪৭ বছরের আলেকজান্দ্রা ক্যাসেল

ময়মনসিংহ প্রতিনিধি: পর্যটন খাতকে কেন্দ্র করে বিশ্বের অনেক দেশ যখন নিজেদের অর্থনৈতিক ভিত মজবুত করছে, তখন ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশে। সঠিক সংরক্ষণ ও প্রশাসনিক নজরদারির অভাবে ময়মনসিংহ অঞ্চলের শতবর্ষী ইতিহাস ও ঐতিহ্য আজ বিলীন হতে বসেছে। কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় ধ্বংসের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে জেলার অন্যতম নিদর্শন 'আলেকজান্দ্রা ক্যাসেল' যা স্থানীয়ভাবে 'লোহার কুঠি' নামে সমধিক পরিচিত।জানা যায়, ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার জমিদার মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী ১৮৭৯ সালে প্রায় ৪৫ হাজার টাকা ব্যয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে বিদেশি অতিথিদের রাজকীয় আবাসন হিসেবে এই ক্যাসেলটি নির্মাণ করেন। ময়মনসিংহ জেলা প্রতিষ্ঠার শতবর্ষ পূর্তি এবং ভারত সম্রাট সপ্তম এডওয়ার্ডের পত্নী সম্রাজ্ঞী আলেকজান্দ্রার স্মরণে এর নামকরণ করা হয়।মিয়ানমার থেকে সংগৃহীত দামি সেগুন কাঠ, লোহা ও সুদৃশ্য কাচের অলংকরণে নির্মিত এই দ্বিতল ভবনটি ছিল সম্পূর্ণ ভূমিকম্পপ্রতিরোধী। প্রকৌশল কৌশলের কারণে এর কক্ষগুলো আবহাওয়ানুকূল থাকত। ১৯২৬ সালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ময়মনসিংহ সফরে এসে এই ক্যাসেলেই অবস্থান করেছিলেন। এছাড়া মহাত্মা গান্ধী, লর্ড কার্জন, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস ও নবাব স্যার সলিমুল্লাহর মতো বরেণ্য ব্যক্তিত্বদের পদচারণায় ধন্য হয়েছে ঐতিহ্যবাহী এই ভবনটি। দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালে এটি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের লাইব্রেরি হিসেবেও ব্যবহৃত হতে থাকে।তবে শতবর্ষী এই গৌরবান্বিত ইতিহাস আজ অবহেলায় ঢাকা পড়েছে। ক্যাসেলটি দেখতে আসা দর্শনার্থী বিনয় হোসাইন ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, এই ক্যাসেলটি ময়মনসিংহের ঐতিহ্য বহন করছে যুগ যুগ ধরে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিরা এখানে এসে জেলাকে পরিচিত করিয়েছেন, কিন্তু আজ এটি চরম অবহেলিত হয়ে ধ্বংস হতে চলেছে।স্থানীয় বাসিন্দা কামরুজ্জামান মিন্টুর মতে, জমিদার আমলের এ স্থাপনা সংরক্ষণ করা হলে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন কেন্দ্র হতে পারত, যা থেকে রাজস্ব আয়ের পাশাপাশি বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান হতো।ইয়ার মাহামুদ নামের এক স্কুল শিক্ষার্থী জানায়, ক্যাসেলটির ইতিহাস সম্পর্কে এখানে কোনো সাইনবোর্ড বা তথ্যবোর্ড নেই। ফলে নতুন প্রজন্ম ও দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরা এর ইতিহাস জানতে পারছে না।অন্যদিকে আসমা তাবাসসুম নামের এক অভিভাবক জানান, পাশেই স্কুল হওয়ায় বাচ্চাদের জন্য বাইরে অপেক্ষা করার সময় প্রায়ই ভেতর থেকে প্লাস্টার ও লোহা খসে পড়ার শব্দ পাওয়া যায়। দিন দিন ভবনটির জরাজীর্ণ অবস্থা বিপজ্জনক রূপ নিচ্ছে।আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক পরিবেশের অবনতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে পুরাকীর্তি সুরক্ষা কমিটির সদস্য সচিব ইমতিয়াজ আহমেদ তানসেন বলেন, চোখের সামনে ইতিহাস ধ্বংস হলেও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা নিরব ভূমিকা পালন করছেন। দিনে-দুপুরে ভবনটি এখন মাদকসেবীদের আখড়ায় পরিণত হয়েছে এবং মূল্যবান লোহার অংশ চুরি হয়ে যাচ্ছে। সচেতন মহলের শঙ্কা, স্থাপনাটি পুরোপুরি ধ্বংস হলে জমি দখলের সুযোগ তৈরি হবে। তাই ইতিহাস হারিয়ে যাওয়ার আগেই দ্রুত সুরক্ষার দাবি জানান তিনি।সার্বিক বিষয়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ময়মনসিংহ বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক আফরোজা খান মিতা জানান, ময়মনসিংহের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো সংস্কার ও সংরক্ষণের জন্য একটি সমন্বিত প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় আলেকজান্দ্রার ক্যাসেলের বর্তমান অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং পর্যালোচনার ভিত্তিতেই দ্রুত সংস্কার কাজ শুরু করা হবে।