রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রস্তুতি ও সাড়াদান ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার আহ্বান
অনলাইন ডেস্ক: পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপদ পরিচালনা নিশ্চিত করতে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়, কার্যকর সাড়াদান ব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত জনবল এবং আন্তর্জাতিক মানসম্মত নির্দেশিকা ও নথিপত্র প্রস্তুতের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন।১৭ অক্টোবর শনিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বায়েরা) অডিটোরিয়ামে ‘স্টেকহোল্ডারস প্রিপারেটরি ওয়ার্কশপ ফর দি আইএইএ এমারজেন্সি প্রিপায়ার্ডনেস এন্ড রিভিউ মিশন টু বাংলাদেশ’ শীর্ষক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন বায়েরার চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান।বিজ্ঞান সচিব বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কমিশনিং ও পরিচালনার পাশাপাশি নিরাপত্তা, সুরক্ষা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জেনারেশন থ্রি প্লাস প্রযুক্তির আধুনিক নিরাপত্তাব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও বিভিন্ন ইন্টারলক ব্যবস্থা রয়েছে। তবে শুধু প্রযুক্তিগত সুরক্ষাব্যবস্থার ওপর নির্ভর করলেই চলবে না; জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় দক্ষ জনবল, কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি এবং সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য।তিনি বলেন, পারমাণবিক জরুরি পরিস্থিতির সম্ভাবনা অত্যন্ত কম হলেও এর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও প্রস্তুতি বজায় রাখতে হবে। এ জন্য আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও পরিবেশগত বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে জরুরি প্রস্তুতি ও সাড়াদান ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) আসন্ন এমারজেন্সি প্রিপায়ার্ডনেস রিভিউ মিশন (ইপিআরইভি)- এর আগমন উপলক্ষে সচিব বলেন, এ মিশনকে কোনো পরীক্ষা বা কাউকে উত্তীর্ণ-অনুত্তীর্ণ করার প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং বাংলাদেশের বিদ্যমান প্রস্তুতি মূল্যায়ন, ঘাটতি চিহ্নিতকরণ এবং আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা থেকে শিক্ষা গ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে সম্পন্ন স্ব-মূল্যায়ন মিশনের প্রস্তুতিতে কার্যকর দিকনির্দেশনা দেবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।আরও পড়ুন: শিশু হাসপাতালে চিকিৎসকের কক্ষে ধুমপান, বরখাস্তের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীরজরুরি পরিস্থিতিতে কখন এবং কীভাবে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হবে, কী প্রক্রিয়ায় জাতীয় পর্যায়ে তথ্য ও নির্দেশনা পৌঁছাবে এবং কেন্দ্রের অভ্যন্তরীণ (অনসাইট) ও কেন্দ্রের বাইরের (অফসাইট) সাড়াদান কার্যক্রমের মধ্যে কীভাবে সমন্বয় নিশ্চিত করা হবে—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট, ধাপভিত্তিক ও সহজবোধ্য নির্দেশিকা প্রণয়নের ওপর তিনি গুরুত্ব দেন। তার মতে, সংশ্লিষ্ট প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব, যোগাযোগব্যবস্থা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে লিখিত নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন।সচিব আরও বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা ও জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার জন্য চিকিৎসাসেবা, রোগী পরিবহন, প্রয়োজনীয় আইসোলেশন, দায়িত্বদান কার্যক্রমে বায়েরা, সংশ্লিষ্ট কারিগরি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনী, চিকিৎসা দল এবং পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বণ্টন এবং বিভিন্ন পর্যায়ে সমন্বিত পদক্ষেপের কার্যকর পরিকল্পনা থাকা জরুরি।পরিবেশ ও বিকিরণ পর্যবেক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশপাশে পরিবেশগত পরিস্থিতি ও বিকিরণমাত্রা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান পর্যবেক্ষণব্যবস্থা থেকে প্রাপ্ত তথ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ, বিশ্লেষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তথ্য বিনিময় নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি কেন্দ্রের কার্যক্রম শুরুর আগের ভিত্তিমাত্রার সঙ্গে পরবর্তী সময়ের তথ্য তুলনা করে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য যাচাই করার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।গণমাধ্যমের ভূমিকা প্রসঙ্গে সচিব বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বিকিরণসংক্রান্ত বিষয়ে জনসাধারণকে সঠিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য জানানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যথাযথ তথ্যের ঘাটতি বা ভুল ব্যাখ্যা থেকে জনমনে অপ্রয়োজনীয় আতঙ্ক সৃষ্টি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরও দায়িত্ব রয়েছে সহজবোধ্য ভাষায় সঠিক তথ্য তুলে ধরা এবং গণমাধ্যমের সঙ্গে কার্যকর তথ্য বিনিময় নিশ্চিত করা।তিনি বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য প্রণীত জরুরি প্রস্তুতি ও সাড়াদানব্যবস্থা বাংলাদেশের অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জন্যও একটি কার্যকর মডেল হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। এ জন্য কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী সব প্রতিষ্ঠানকে বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ কাজে লাগানোর আহ্বান জানান তিনি। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি'র বক্তব্য রাখেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পারমাণবিক শক্তি) আবুল খায়ের মো. আক্কাস আলী।আরও পড়ুন: ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার: দুর্গাপূজার শুভেচ্ছাবার্তায় প্রধানমন্ত্রীকর্মশালায় সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান বলেন, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় মাঠপর্যায়ের প্রথম সাড়াদানকারী থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী পর্যন্ত প্রত্যেকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কর্মশালায় সংশ্লিষ্ট সব গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনের উপস্থিতি বাংলাদেশের সমন্বিত প্রস্তুতি ও সক্ষমতার প্রতিফলন।বায়েরা চেয়ারম্যান আরও বলেন, কর্মশালার মূল লক্ষ্য হলো আইএইএ-এর ইপিআরইভি মিশন সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে অভিন্ন ধারণা তৈরি, স্ব-মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রস্তুতির ঘাটতি চিহ্নিত করা এবং আসন্ন মিশন উপলক্ষে প্রত্যেক অংশীজনের দায়িত্ব ও করণীয় সুনির্দিষ্ট করা।তিনি আশা প্রকাশ করেন, সংশ্লিষ্ট সবার সক্রিয় অংশগ্রহণ, মূল্যবান মতামত ও সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাংলাদেশ আসন্ন আইএইএ মিশনে তার পারমাণবিক নিরাপত্তা ও জরুরি প্রস্তুতি ব্যবস্থার সক্ষমতা তুলে ধরতে সক্ষম হবে।কর্মশালায় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধি, কারিগরি বিশেষজ্ঞ, পাবনা ও কুষ্টিয়া জেলার স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী, চিকিৎসা দল এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা অংশগ্রহণ করেন।কর্মশালাটির মাধ্যমে আইএইএ-এর আসন্ন মিশনের জন্য সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের প্রস্তুতি জোরদার, জরুরি পরিস্থিতিতে আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশের পারমাণবিক নিরাপত্তা ও জরুরি সাড়াদান সক্ষমতা আরও উন্নত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সাধিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। কর্মশালায় বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) ইমার্জেন্সি প্রিপেয়ার্ডনেস রিভিউ (ইপিআরইভি) মিশনের আগমন উপলক্ষে একটি বুকলেটের মোড়ক উন্মোচন করা হয়।এটিভি/এসটিও