ইরানকে ৯০টি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণযন্ত্র সরবরাহ রাশিয়ার, ফাঁস নথিতে তথ্য
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানকে ৯০টি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণযন্ত্র সরবরাহের পরিকল্পনা করেছিল রাশিয়া। মস্কো ও তেহরানের সামরিক সহযোগিতার গভীরতা নিয়ে ফাঁস হওয়া রুশ প্রতিরক্ষা শিল্পের একগুচ্ছ নথিতে এ তথ্য উঠে এসেছে।ইউক্রেনের বেসরকারি গোয়েন্দা সংস্থা ‘ডালাস অ্যানালিটিক্স’-এর কাছ থেকে পাওয়া নথিগুলো পর্যালোচনা করে এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান। নথি অনুযায়ী, রাশিয়ার তৈরি উন্নত নির্দেশিত ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য এসব উৎক্ষেপণযন্ত্র সরবরাহের পরিকল্পনা ছিল। তবে সেগুলো শেষ পর্যন্ত ইরানে পৌঁছেছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।ফাঁস হওয়া নথিতে ‘এলএমইউআর’ নামের একটি নির্দেশিত ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য উৎক্ষেপণযন্ত্র সরবরাহের কথা উল্লেখ রয়েছে। হেলিকপ্টার থেকে নিক্ষেপযোগ্য এই ক্ষেপণাস্ত্রটি ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে দেশটির সেনাবাহিনী ব্যবহার করে আসছে।রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও উৎক্ষেপণব্যবস্থা নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘ভিম্পেল’-এর ২০২৪ সালের মে মাসে তৈরি উৎপাদনসূচিতে ‘কে-১০’ নামে একটি রপ্তানি চুক্তির অধীনে ৯০টি উৎক্ষেপণযন্ত্রের অর্ডার দেখা যায়। পৃথক কিছু অভ্যন্তরীণ নথিতে ‘কে-১০’ বলতে ইরানকে বোঝানো হয়েছে।নথিতে ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সরবরাহের সময়সূচির উল্লেখ রয়েছে। তবে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী এসব সরঞ্জাম ইরানে পাঠানো হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট তথ্য নেই। অন্যদিকে, ২০২৩ সালে ইরানের জন্য ছয়টি ইয়াক-১৩০ প্রশিক্ষণ বিমান তৈরির একটি পৃথক উৎপাদনসূচির তথ্য প্রকাশ্যে আসা সরবরাহের খবরের সঙ্গে মিলে যায়।বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে ঘিরে দীর্ঘায়িত যুদ্ধ রাশিয়ার জন্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা তৈরি করেছে। হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। এতে রাশিয়ার তেল বিক্রি থেকে আয় বাড়ছে, যা ইউক্রেন যুদ্ধে অর্থায়ন এবং দেশটির অর্থনীতির ওপর চাপ কমাতে সহায়তা করছে।একই সঙ্গে এই যুদ্ধ ইউক্রেন থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ ও পশ্চিমা সামরিক সম্পদের একটি অংশ অন্যদিকে সরিয়ে নিয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্র পাওয়ার ক্ষেত্রে কিয়েভের চ্যালেঞ্জ আরও বেড়েছে।মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবারই ইরানের প্রতি রাশিয়ার সমর্থনের বিষয়টি খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। গত মাসে তিনি দাবি করেন, তেহরানকে সহায়তার জন্য রাশিয়া ‘খুব সামান্যই, কিংবা প্রায় কিছুই করছে না’। ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে মস্কোকে আলোচনার টেবিলে রাখতে চান বলেই ট্রাম্প এমন অবস্থান নিয়েছেন বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।তবে ট্রাম্পের বক্তব্যের সঙ্গে ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পাওয়া তথ্যের অমিল রয়েছে। এসব সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীকে লক্ষ্যবস্তু করতে ইরানকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও উপগ্রহের ছবি সরবরাহ করেছে রাশিয়া। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য তেহরানকে বিস্ফোরকবাহী ড্রোন সরবরাহের প্রস্তুতি নিচ্ছে মস্কো বলেও সতর্ক করেছে ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকেই দুই দেশের সামরিক সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ওই সময় ইরান রাশিয়ার কাছে ‘শাহেদ’ হামলাকারী ড্রোন সরবরাহের অন্যতম প্রধান উৎস হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে রাশিয়া নিজ দেশেই এসব ড্রোন উৎপাদন শুরু করে।তবে বর্তমান সংঘাতে ইরানকে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের খবর বরাবরই অস্বীকার করে আসছে মস্কো। ২০২৫ সালে দুই দেশ একটি কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করে। এতে অভিন্ন হুমকি মোকাবিলায় পারস্পরিক সহযোগিতার বিধান রয়েছে। তবে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার নিরাপত্তা চুক্তির মতো পারস্পরিক প্রতিরক্ষার বাধ্যবাধকতা এতে রাখা হয়নি।তা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তেহরান ও মস্কোর মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রয়েছে। গত অক্টোবর মাসেই দুই দেশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা তিনটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেন।যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সম্পর্কের অবনতি এড়াতে ইরানের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতার বিষয়টি প্রকাশ্যে আনার ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে মস্কো। পাশাপাশি ইউক্রেন যুদ্ধে অস্ত্রের চাহিদা মেটাতে গিয়ে রাশিয়ার নিজস্ব প্রতিরক্ষা উৎপাদন খাতও ব্যাপক চাপে রয়েছে। ফলে ইরানকে অস্ত্র সরবরাহের ক্ষেত্রে দেশটিকে কিছু সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে হচ্ছে।ফাঁস হওয়া নথিতে রুশ প্রতিরক্ষা শিল্পের এই চাপের চিত্রও উঠে এসেছে। ২০২৪ সালের মে মাসে পাঠানো এক চিঠিতে ‘ভিম্পেল’ প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সরবরাহে বিলম্বের বিষয়ে সতর্ক করে। এতে বলা হয়, যন্ত্রাংশ সময়মতো না পেলে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণযন্ত্র সংযোজনের কাজ ব্যাহত হতে পারে। একই সঙ্গে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলোও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।এটিভি/এসআইআর