স্পোর্টস ডেস্ক: ১৬ বছর আগে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই শুরু হয়েছিল এক স্বপ্নের যাত্রা। সেই মাঠেই অভিষেকে গোল করেছিলেন এক কিশোর, যার নাম নেইমার জুনিয়র। সময়ের পরিক্রমায় তিনি হয়েছেন ব্রাজিলের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা। যে মাঠ তাকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল, সেই মাঠেই এবার খালি হাতেই শেষ হলো সেলেসাও জার্সিতে তাঁর পথচলা। নরওয়ের কাছে ব্রাজিলের বিদায়ের রাতে অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেন এই মহাতারকা।
উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতেই থেমে গেল ব্রাজিলের হেক্সা জয়ের আরেকটি অভিযান। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় ৫ জুলাই রোববার দিবাগত রাতে অনুষ্ঠিত ম্যাচে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যায় পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। শেষ বাঁশি বাজার পর আবেগ সামলাতে পারেননি নেইমার। মাঠেই কান্নায় ভেঙে পড়েন, এরপর জানিয়ে দেন জাতীয় দলের জার্সিতে আর দেখা যাবে না তাকে।
বিদায়ী ঘোষণায় আবেগঘন কণ্ঠে নেইমার বলেন, ‘আমি চেষ্টা করেছি। এই মেট লাইফ স্টেডিয়ামে শুরু হয়েছিল (আমার পথচলা), এখানেই শেষ করলাম। যাত্রা এখানেই শেষ।’
২০১০ সালের ১০ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে এই মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই ব্রাজিলের হয়ে অভিষেক হয়েছিল নেইমারের। ২-০ ব্যবধানের সেই জয়ে গোল করে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সূচনা করেছিলেন তিনি। প্রায় ১৬ বছর পর একই মাঠে শেষ ম্যাচেও জালের দেখা পেলেও সেটি আর হাসি এনে দিতে পারেনি। আর্লিং হালান্ডের জোড়া গোলে পিছিয়ে পড়া ব্রাজিলের হয়ে যোগ করা সময়ে পেনাল্টি থেকে একটি গোল শোধ করেন নেইমার। কিন্তু ততক্ষণে বিদায়ের বেদনা নিশ্চিত হয়ে গেছে।
জাতীয় দলের হয়ে নিজের গোলসংখ্যাও বাড়িয়ে নিয়েছেন এই ফরোয়ার্ড। ১৩০ ম্যাচে ৮০ গোল নিয়ে আগেই ব্রাজিলের সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন, বিদায়ী ম্যাচেও সেই রেকর্ড আরও সমৃদ্ধ করলেন। তবে ব্যক্তিগত অর্জনের ঝুলিতে গোলের প্রাচুর্য থাকলেও দলগত সাফল্যের খাতায় আক্ষেপ থেকেই গেল। ব্রাজিলের হয়ে তার একমাত্র বড় শিরোপা ২০১৩ সালের ফিফা কনফেডারেশন্স কাপ, যে প্রতিযোগিতার অস্তিত্বই এখন আর নেই। ২০১৯ সালে ব্রাজিল কোপা আমেরিকা জিতলেও সেই আনন্দের অংশ হতে পারেননি নেইমার। টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই চোটে ছিটকে যাওয়ায় মাঠে নামার সুযোগ হয়নি তার।
ক্লাব ফুটবলেও গত কয়েক বছর ধরে চোট যেন তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। ২০২৩ সালের অক্টোবরে ব্রাজিলের হয়ে খেলতে গিয়ে গুরুতর ইনজুরিতে পড়ার পর দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে ছিলেন। এরপর বারবার ফিরে আসার চেষ্টা করলেও পুরোপুরি ছন্দে ফিরতে পারেননি।
অবশেষে ২০২৫ সালের শুরুতে আল হিলাল ছেড়ে ফিরে যান শৈশবের ক্লাব সান্তোসে। লক্ষ্য ছিল একটাই, ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা। কিন্তু সেখানেও চোট তাকে স্বস্তিতে থাকতে দেয়নি।
কার্লো আনচেলত্তি ব্রাজিলের দায়িত্ব নেওয়ার পর বিশ্বকাপের আগে কোনো ম্যাচেই নেইমারকে দলে ডাকেননি। তবু অভিজ্ঞতার ওপর ভরসা রেখে বিশ্বকাপের ২৬ সদস্যের দলে জায়গা দেন ৩৪ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ডকে। প্রায় তিন বছর পর গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে জাতীয় দলে ফেরেন তিনি। সেই ম্যাচে খেলেছিলেন ১৪ মিনিট, আর নরওয়ের বিপক্ষে মাঠে ছিলেন ২৩ মিনিট। সেই ৩৭ মিনিটই হয়ে থাকল ব্রাজিলের জার্সিতে নেইমারের শেষ অধ্যায়।
জাতীয় দলের সঙ্গে পথচলার ইতি টানলেও ফুটবলকে বিদায় বলছেন না নেইমার। ব্রাজিলিয়ান ক্লাব সান্তোসের জার্সিতে ক্লাব ক্যারিয়ার চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। তবে সেলেসাও সমর্থকদের জন্য এ রাত চিরকাল মনে থাকবে এক অপূর্ণ স্বপ্নের, যেখানে দেশের সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার বিদায় নিলেন বিশ্বকাপ ট্রফিটা ছুঁয়ে দেখতে না পারার আক্ষেপ নিয়েই।
(এই ওয়েবসাইটের যেকোনো কিছু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি)
© 2026, এশিয়ান অনলাইন টিভি  |  সর্বস্বত্ব সংরক্ষিতDeveloped by Future IT
Recent comments
Latest Comments section by users
No comment available