• ঢাকা
  • |
  • রবিবার ২৬শে আশ্বিন ১৪৩৩ দুপুর ১২:০৯:২৭ (11-Oct-2026)
  • - ৩৩° সে:

রূপপুর ঘিরে জ্বালানি নিরাপত্তা ও শিল্পায়নের নতুন প্রত্যাশা

১১ অক্টোবর ২০২৬ সকাল ১১:২৯:১৩

রূপপুর ঘিরে জ্বালানি নিরাপত্তা ও শিল্পায়নের নতুন প্রত্যাশা

ডেস্ক রিপোর্ট: দেশের বিদ্যুৎ খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে যাচ্ছে পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর আগে গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি অগ্রগতি হয়েছে। নিরাপত্তা ভালভের পরীক্ষার ফল অনুমোদিত হওয়ায় পরবর্তী ধাপের কমিশনিং কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ এগোলে আগামী মাসে কেন্দ্রটি থেকে পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে।

রূপপুরের দুটি ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এতে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস আরও বৈচিত্র্যময় হবে। পাশাপাশি গ্যাস, কয়লা ও তেলনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ শিল্প উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে তাপ উৎপাদনের প্রক্রিয়া শুরুর পরিকল্পনা ছিল গত সেপ্টেম্বরে। তবে নিরাপত্তা ভালভের পরীক্ষায় ত্রুটি ধরা পড়ায় পরবর্তী কার্যক্রম পিছিয়ে যায়। পরে উচ্চ চাপে দুই দফা পরীক্ষা শেষে ফলাফল নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হয়। গত বৃহস্পতিবার পরীক্ষার ফল অনুমোদন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

পরীক্ষায় ভালভগুলো নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী কাজ করছে কি না, তা যাচাই করা হয়। পাশাপাশি অগ্নিনিরাপত্তা ও তেজস্ক্রিয়তাসংক্রান্ত নিরাপত্তাব্যবস্থাও পরীক্ষা করা হয়।

এই অনুমোদনের ফলে চুল্লির পরবর্তী কমিশনিং কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু, চুল্লির ক্ষমতা ধাপে ধাপে বাড়ানো, টারবাইন চালু এবং জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ—এগুলো পৃথক ধাপ। প্রতিটি পর্যায়ে প্রয়োজনীয় কারিগরি পরীক্ষা ও নিরাপত্তা যাচাই সম্পন্ন করতে হবে।

রূপপুরের প্রথম ইউনিটের সামনে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হলো ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’। এ পর্যায়ে চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিত ও স্বনির্ভর পারমাণবিক শৃঙ্খল বিক্রিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে চুল্লির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হবে। এ পর্যায়ের পরীক্ষা সম্পন্ন করতে প্রায় এক মাস সময় লাগতে পারে বলে প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের ধারণা।

এরপর ধাপে ধাপে চুল্লির তাপ উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানো হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে পরীক্ষামূলক উৎপাদন, টারবাইন ও অন্যান্য কারিগরি ব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন শেষে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে আরও সময় লাগবে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। রাশিয়ার কারিগরি সহায়তায় নির্মিত এ কেন্দ্রে ব্যবহার করা হচ্ছে তৃতীয় প্রজন্মের ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তি। দুটি ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদনক্ষমতা হবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট।

প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের দীর্ঘমেয়াদি হিসাব অনুযায়ী, পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদিত বিদ্যুৎ দেশের মোট চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশ পূরণ করতে পারে। তবে প্রকৃত অবদান নির্ভর করবে সে সময়ের বিদ্যুৎ চাহিদা, কেন্দ্রের উৎপাদন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং জাতীয় গ্রিডের সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর।

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা, তেল বা গ্যাস পুড়িয়ে তাপ উৎপাদন করতে হয় না। চুল্লির ভেতরে ইউরেনিয়ামের পরমাণু বিভাজনের মাধ্যমে তাপ তৈরি হয়। সেই তাপে পানি থেকে বাষ্প উৎপন্ন করা হয়। বাষ্পের চাপে টারবাইন ঘোরে এবং টারবাইনের সঙ্গে যুক্ত জেনারেটর বিদ্যুৎ উৎপাদন করে।

রূপপুর কেন্দ্রের পরিকল্পিত আয়ুষ্কাল ৬০ বছর। প্রয়োজনীয় কারিগরি সংস্কার, নিরাপত্তা মূল্যায়ন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন সাপেক্ষে এ মেয়াদ আরও ২০ থেকে ৩০ বছর বাড়ানোর সুযোগ থাকতে পারে।

তবে দীর্ঘ সময় কেন্দ্রটি সচল রাখতে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা পরীক্ষা ও জ্বালানি পরিবর্তন করতে হবে। প্রচলিত পরিচালন পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রায় দেড় বছর পরপর নতুন পারমাণবিক জ্বালানি দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। এ সময় জ্বালানি পরিবর্তন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হবে।

রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা স্বাধীনতার পরপরই আলোচনায় আসে। বিভিন্ন সময়ে সম্ভাব্যতা যাচাই ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রকল্পটি বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় লেগেছে।

১৯৭৭ সালে ফরাসি প্রতিষ্ঠান সফরাটমের মাধ্যমে রূপপুরে ১২৫ মেগাওয়াটের একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হয়। তবে তখন প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়নি।

পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সমীক্ষা ও প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে পরিকল্পনাটি এগিয়ে নেওয়া হয়। ১৯৯৬ সালের জাতীয় জ্বালানি নীতিতে পারমাণবিক শক্তিকে বিকল্প জ্বালানি উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০০৫ সালে চীনের সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তি এবং ২০০৭ সালে ৫০০ মেগাওয়াট করে দুটি ইউনিট স্থাপনের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়।

পরবর্তী সময়ে রাশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতার ভিত্তিতে বর্তমান প্রকল্পের কাঠামো নির্ধারণ করা হয়। ২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রকল্প এলাকায় পারমাণবিক জ্বালানি পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে কেন্দ্রটি কমিশনিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে প্রবেশ করে। এখন প্রথম ইউনিটের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা বাস্তব উৎপাদনের কাছাকাছি পৌঁছেছে।

বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারের সময়ে প্রকল্পটি এগিয়েছে। বিএনপির ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারেও রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রতিশ্রুতি ছিল। ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারেও শান্তিপূর্ণভাবে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার অব্যাহত রাখার কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানো, স্মার্ট গ্রিড সম্প্রসারণ, কম ব্যয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের লক্ষ্যের কথাও ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় রূপপুরের গুরুত্ব শুধু উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ, জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশগত লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রেও প্রকল্পটি ভূমিকা রাখতে পারে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের পারমাণবিক শক্তি উইংয়ের যুগ্ম সচিব শেখ মুহম্মদ তৌহিদুল ইসলাম রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্প নয়; এটি বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নেরও বড় সুযোগ।

তিনি জানান, প্রথম ইউনিট উৎপাদনের প্রস্তুতির চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। দ্বিতীয় ইউনিটের ইউরেনিয়ামও প্রকল্প এলাকায় পৌঁছেছে। নির্ধারিত সময়ের আগেই কাজ শেষ করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

একই উইংয়ের অতিরিক্ত সচিব বাসসকে বলেন, রূপপুর কেন্দ্র চালু হলে দেশের বিদ্যুৎ ও অর্থনীতির প্রচলিত হিসাব-নিকাশে পরিবর্তন আসতে পারে। ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি শিল্পকারখানার উৎপাদন বাড়ানো, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখবে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন বাসসকে বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহের মাধ্যমে শিল্পায়ন, বিনিয়োগ ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক মানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পারমাণবিক প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কাজ করছে।

রূপপুর প্রকল্প বাস্তবায়নে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি করপোরেশন রোসাটম কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে। প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ ও সমন্বয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগ দায়িত্ব পালন করছে।

রূপপুরের দুটি ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় সংযোজন ঘটবে। তবে অর্থনীতিতে এর সুফল কতটা বিস্তৃত হবে, তা নির্ভর করবে উৎপাদন ব্যয়, কেন্দ্রের নির্ভরযোগ্যতা, জাতীয় গ্রিডের সক্ষমতা এবং শিল্প ও ব্যবসা খাতে বিদ্যুতের কার্যকর ব্যবহারের ওপর।

সূত্র: বাসস

Recent comments

Latest Comments section by users

No comment available

সর্বশেষ সংবাদ





ইরান যুদ্ধে নিহত মার্কিন সেনা ২১, আহত ৮৬৫
ইরান যুদ্ধে নিহত মার্কিন সেনা ২১, আহত ৮৬৫
১১ অক্টোবর ২০২৬ সকাল ১১:৪০:২৯