ডেস্ক রিপোর্ট: সাভারের একটি মাদ্রাসায় সাত বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীর ওপর যৌন নিপীড়নের অভিযোগের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন দেশের ৬০০ জন বিশিষ্ট আলেম। একই সঙ্গে অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তারা।
১৫ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার ‘মূল্যবোধ আন্দোলন’-এর চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেনের পাঠানো এক বিবৃতিতে এ দাবি জানানো হয়।
বিবৃতি বলা হয়েছে, আমরা দেশের সচেতন উলামায়ে কেরাম সাভারের একটি মাদরাসায় সাত বছরের একজন শিক্ষার্থীর ওপর শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত যৌন নিপীড়নের খবরে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন ও মর্মাহত। দ্বীনি ও নৈতিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের অপরাধ কেবল নীতি-নৈতিকতার অবক্ষয় নির্দেশ করে না, বরং শিক্ষার্থীদের সার্বিক নিরাপত্তাকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলে।
আলেমরা বলেন, ইসলামে সব ধরনের অনৈতিক যৌন সম্পর্ক, প্রকৃতিবিরুদ্ধ আচরণ ও যৌন নিপীড়ন, বিশেষ করে সমকামিতা, কঠোরভাবে নিষিদ্ধ এবং গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। কোমলমতি শিশুদের ওপর সমকামী সহিংসতায় লিপ্ত ছাত্র ও শিক্ষকের সঙ্গে ইসলামি আদর্শ ও মাদরাসার পবিত্র পরিবেশের কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না।
বিবৃতিতে আরও দাবি করা হয়, বিভিন্ন গবেষণামূলক বিশ্লেষণে জানা যায় যে সমকামী ও উভকামীদের মাধ্যমে শিশুদের যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। সমাজে এই সমকামী প্রবণতা প্রতিরোধ না করা গেলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সর্বত্র শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। বিগত কয়েক বছর ধরে পশ্চিমা অর্থায়নে বিভিন্ন এনজিওর মাধ্যমে সমকামী আচরণকে স্বাভাবিকীকরণের কার্যক্রম দৃশ্যমানভাবে বেড়েছে।
একদিকে এনজিও সহযোগিতা ও বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে সমকামী নেটওয়ার্ক বিস্তৃতি লাভ করেছে, অন্যদিকে সমকামিতা প্রতিরোধমূলক দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারাকে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে সমকামিতার ব্যাধি ধীরে ধীরে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে, এমনকি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও তা ছড়িয়ে পড়েছে। মাদরাসা সমাজের বাইরে ভিন্ন গ্রহের কোনো ভূখণ্ড নয়। সমাজে যখন কোনো অবক্ষয়ের বন্যা বইতে থাকে, মাদরাসাও তার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারে না।
বিবৃতিতে আলেম-ওলামারা বলেন, তবে আমরা চাই মানুষের আস্থার জায়গা মাদরাসাগুলোতে একটিও অনাচার না ঘটুক। আমরা বিশ্বাস করি কোরআন-সুন্নাহর আইনের সঠিক প্রয়োগেই এই সমস্যার সমাধান নিহিত রয়েছে। কিন্তু যতদিন পর্যন্ত কোরআন-সুন্নাহর আইন প্রতিষ্ঠিত না হচ্ছে বিদ্যমান আইনের প্রয়োগের মাধ্যমে হলেও এই সামাজিক অবক্ষয়কে প্রতিরোধের আহ্বান জানান তারা।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ইংল্যান্ডে ১৫৩৩ সালে রাজা অষ্টম হেনরির আমলে সমকামী আচরণ ও পশুকামিতার বিরুদ্ধে ‘Buggery Act 1533’ পাস করা হয়েছিল। ওই আইনের মূল ধারণার ভিত্তিতে ব্রিটিশরা তাদের উপনিবেশগুলোতে ৩৭৭ ধারার বিভিন্ন সংস্করণ তৈরি করে এবং তাদের অধীনস্থ ৫০টিরও বেশি ঔপনিবেশিক অঞ্চলে প্রকৃতিবিরুদ্ধ অপরাধসংক্রান্ত একই ধরনের আইন জারি করেছিল বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
আলেমরা বলেন, সেই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারাতেও প্রকৃতিবিরুদ্ধ ও অস্বাভাবিক যৌন অপরাধের বিচার ও শাস্তির বিধান রয়েছে। তবে ধারাটির কার্যকর প্রয়োগ না হওয়ায় অনৈতিকতার বিস্তার ঘটছে বলে তারা দাবি করেন।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ৯২ শতাংশ মুসলিম অধ্যুষিত একটি দেশ, আর ইসলামের দৃষ্টিতে সমকামিতা একটি নিকৃষ্টতম পাপাচার। আমরা চাই সমকামিতার মতো পাপাচার বা সমকামী সহিংসতা স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, ভার্সিটি, মেস যেখানেই ঘটুক, অপরাধীদের ৩৭৭ ধারার আওতায় নিয়ে এসে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক এবং সমকামিতার প্রচার প্রসারের সঙ্গে জড়িত প্রতিটি এনজিওর বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।
সাভারের মাদ্রাসার ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতারের দাবি জানিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, ওই ‘নজিরবিহীন ন্যাক্কারজনক’ ঘটনায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত প্রত্যেক অপরাধীকে অবিলম্বে গ্রেফতার করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ৩৭৭ ধারাসহ অন্যান্য প্রযোজ্য আইনের আওতায় এনে যথাযথ ও সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ যাতে কেউ করার সাহস না পায়, সে জন্য দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানানো হয়।
বিবৃতি প্রদানকারীদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা ‘মূল্যবোধ আন্দোলন’-এর ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি মুহাম্মাদ আবদুল মালেক, বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক, ড্যাফোডিল ইসলামিক সেন্টারের পরিচালক প্রফেসর মোখতার আহমাদ, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মুফতি আজিজুল হক ইসলামাবাদী, মাসজিদুত তাকওয়া ধানমন্ডির খতিব মুফতি সাইফুল ইসলাম, সাইন্সল্যাব বায়তুল মামুর জামে মসজিদের খতিব মাওলানা হাসান জামিল এবং মাসজিদুল জুমা কমপ্লেক্স পল্লবীর খতিব আব্দুল হাই মুহাম্মাদ সাইফুল্লাহ।
এ ছাড়া বিবৃতিদাতাদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের নায়েবে আমির মাওলানা মুজিবুর রহমান হামিদী, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মুফতী মাসউদুল করীম, বাইতুশ শাকুর জামে মসজিদ মিরপুরের খতিব ড. হাফেজ এবিএম হিজবুল্লাহ, মারকাযু দিরাসাতিল ইকতিসাদিল ইসলামীর মুহতামিম ড. মুফতি ইউসুফ সুলতান, মহানগর প্রজেক্ট জামে মসজিদের খতিব মাওলানা তাহমীদুল মাওলা, ফজর ইনস্টিটিউট ঢাকার মুহতামিম রুহুল আমীন সাদী, জামেয়া মাহমুদিয়া যাত্রাবাড়ীর শিক্ষক মুফতি রেজাউল কারীম আবরার, রূপায়ন সিটি জামে মসজিদের খতিব মুফতি মুহাম্মাদ শামছুদ্দোহা আশরাফী, মাদরাসাতু বানাতিল ইসলাম ঢাকার খতিব আবদুল্লাহ আল ফারুক, দ্বীনিয়াত বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মুফতি সালমান আহমদ, মাদ্রাসাতুল কুরআন লিলবানাত মুহাম্মদপুরের মুহতামিম মুফতি সাঈদ আহমাদ, সুনিবিড় হাউজিং সোসাইটি জামে মসজিদ মুহাম্মাদপুরের খতিব মুফতি আরিফ জাব্বার কাসেমী, তা’লীমুল ইসলাম ইনস্টিটিউট অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার ঢাকার মুহতামিম মুফতি লুৎফুর রহমান ফরায়েজী, সরকারি তিতুমীর কলেজ জামে মসজিদের খতিব মুফতি ইরফান জিয়া এবং মসজিদ-ই বাক্কাতিল মোবারকাহ কলাবাগানের খতিব মুফতি আবু মুহাম্মাদ রাহমানী।
সূত্র: ইত্তেফাক
(এই ওয়েবসাইটের যেকোনো কিছু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি)
© 2026, এশিয়ান অনলাইন টিভি  |  সর্বস্বত্ব সংরক্ষিতDeveloped by Future IT
Recent comments
Latest Comments section by users
No comment available