আন্তর্জাতিক ডেস্ক: কয়েক বছর আগে ইসরায়েল-লেবানন সীমান্তে হেজবুল্লাহ-এর তৎপরতা নিয়ে সামরিক প্রতিবেদনে প্রথম ইরানের ড্রোনের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। পরে ইয়েমেনে হুথি গোষ্ঠী-এর ব্যবহৃত ড্রোন বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সেগুলোর সঙ্গেও ইরানের সম্পর্ক পাওয়া যায়।
তবে ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ চলাকালে ইরান যখন রাশিয়াকে ড্রোন প্রযুক্তি সরবরাহ করে, তখন বিষয়টি বৈশ্বিক আলোচনায় উঠে আসে। ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ-এর আকাশে ‘জেরেনিয়াম-২’ (শাহেদ-১৩৬) ড্রোন দেখা যাওয়ার পর এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।


নিষেধাজ্ঞা থেকেই আত্মনির্ভরতার পথচলা

১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লব-এর পর ইরানের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এর ফলে দেশটি বাধ্য হয় নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়ে তুলতে।
তৎকালীন নেতৃত্ব দেশীয় প্রকৌশলী ও শিক্ষার্থীদের ওপর আস্থা রেখে গবেষণা ও উদ্ভাবনে জোর দেয়। একই সঙ্গে বিদেশ থেকে যন্ত্রাংশ সংগ্রহের জন্য গোপন সরবরাহ নেটওয়ার্কও গড়ে তোলে।
১৯৮০ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধ শুরু হলে ইরান বড় ধরনের সামরিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। যন্ত্রাংশের অভাবে উন্নত যুদ্ধবিমানগুলো কার্যত অকেজো হয়ে যায়।
এই পরিস্থিতিতে ইরানি সামরিক নেতৃত্ব বিকল্প চিন্তা করে—ছোট, কম খরচের এবং দূরনিয়ন্ত্রিত উড়োজাহাজ ব্যবহার করে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা।
১৯৮১ সালে ইসফাহান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়-এর শিক্ষার্থী ও প্রকৌশলীরা এই ধারণা বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেন। সাধারণ কর্মশালায় তৈরি প্রাথমিক ড্রোনগুলো প্রথমে অনেকের কাছে খেলনার মতো মনে হলেও, ১৯৮৩ সালে এগুলো সফলভাবে শত্রুপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করতে সক্ষম হয়।
প্রাথমিকভাবে নজরদারির জন্য ব্যবহৃত হলেও, ১৯৮৭ সালের পর ইরান ড্রোনকে আক্রমণাত্মক অস্ত্রে রূপান্তরের উদ্যোগ নেয়। এর ফলেই ‘মোহাজের’ সিরিজের ড্রোন তৈরি হয়।
১৯৮৮ সালের মধ্যে ইরান যুদ্ধক্ষেত্রে সশস্ত্র ড্রোন ব্যবহারের পথিকৃৎ দেশগুলোর একটি হয়ে ওঠে।
ড্রোন প্রযুক্তিতে ইসরায়েল ছিল অগ্রগামী। ১৯৭৩ সালের ইয়োম কিপুর যুদ্ধ এবং ১৯৮২ সালে লেবাননে অভিযানের সময় তারা ‘স্কাউট’ ও ‘ম্যাস্টিফ’ ড্রোন ব্যবহার করে। ইরান এই অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে এবং অনেক ক্ষেত্রে ইসরায়েলি নকশা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে নিজস্ব প্রযুক্তি উন্নয়ন করে।
ইরানের সবচেয়ে বড় উদ্ভাবন প্রযুক্তিগত নয়, বরং কৌশলগত। প্রচলিত ধারণায় উন্নত ও ব্যয়বহুল অস্ত্রই সবচেয়ে কার্যকর। কিন্তু ইরান দেখিয়েছে, কম খরচের বিপুল সংখ্যক ড্রোন ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চাপে ফেলা সম্ভব।
একটি ড্রোন তৈরির খরচ প্রায় ২০ হাজার ডলার। কিন্তু সেটি ভূপাতিত করতে ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রের খরচ হতে পারে কয়েক মিলিয়ন ডলার
অর্থাৎ, ১০০টি ড্রোন ধ্বংস করতে প্রতিপক্ষকে কয়েকশ গুণ বেশি ব্যয় করতে হয়।
ড্রোনের কিছু বড় সুবিধা হলো: কম উচ্চতায় ও ধীরগতিতে উড়ে, ফলে রাডারে ধরা কঠিন, একসঙ্গে অনেকগুলো পাঠানো যায়, দীর্ঘ সময় ধরে হামলা চালানো সম্ভব এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অতিরিক্ত চাপে ফেলে।
২০১৯ সালে সৌদি আরামকো-এর স্থাপনায় হামলা এই কৌশলের বাস্তব উদাহরণ। কম খরচের ড্রোন দিয়ে বড় অর্থনৈতিক ক্ষতি করা সম্ভব হয়।
প্রাথমিকভাবে ৫০ কিলোমিটার উড়তে সক্ষম ড্রোন থেকে আজ ইরান এমন প্রযুক্তি তৈরি করেছে, যা একাধিক দেশের আকাশসীমা অতিক্রম করে দূরপাল্লার লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে।
ইরানের ড্রোন কর্মসূচি দেখিয়েছে, সামরিক শক্তি শুধু উন্নত প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে না—বরং কৌশল, ধৈর্য এবং ব্যয়ের ভারসাম্যের ওপরও নির্ভর করে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান মূলত যুদ্ধের ‘নিয়ম’ বদলে দিয়েছে— যেখানে সস্তা কিন্তু কার্যকর প্রযুক্তি দিয়েও শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলা সম্ভব।
সূত্র: বিবিসি
(এই ওয়েবসাইটের যেকোনো কিছু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি)
© 2026, এশিয়ান অনলাইন টিভি  |  সর্বস্বত্ব সংরক্ষিতDeveloped by Future IT
Recent comments
Latest Comments section by users
No comment available