নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজধানীতে আবাসিক এলাকায় দিনের অধিকাংশ সময় গ্যাস না থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন বাসিন্দারা। নিয়মিত বিল দিয়েও এই প্রাকৃতিক জ্বালানির ন্যূনতম সরবরাহ না পাওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে। রান্নাবান্না করতে না পারায় পরিবারগুলো নিয়মিত তিন বেলা খেতেও পারছে না। অনেকে বাড়তি টাকা দিয়ে সিলিন্ডার কিনে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। এতে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে দৈনন্দিন জীবনযাত্রা।

তিতাসের পাইপলাইনের গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় এলপি গ্যাস বা সিলিন্ডারের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে। কিন্তু এক মাস ধরে সিলিন্ডারের বাজারে চরম নৈরাজ্য চালাচ্ছে সরবরাহকারী ও ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট। এতে বহুমাত্রিক রূপ নিচ্ছে এই সংকট। নির্ধারিত এক হাজার ২৫৩ টাকার পরিবর্তে কোথাও কোথাও সিলিন্ডারের দাম প্রায় দুই হাজার টাকায় পৌঁছেছে। বাড়তি দাম দিয়েও অনেক ক্ষেত্রে এলপিজি পাওয়া যাচ্ছে না।


ভুক্তভোগীরা জানান, কয়েক সপ্তাহ ধরে রাজধানীর আর কে মিশন রোড, গোপীবাগ, মানিকনগর, মিয়াজান লেন, যাত্রাবাড়ী, মাতুয়াইল, কাজলাপাড়, ভাঙ্গা প্রেস, শনিরআখড়া, মগবাজারের নয়াটোলা, চেয়ারম্যানগলি, রামপুরা, বাড্ডাসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস সংকট চরমে পৌঁছেছে। মিরপুর, মোহাম্মদপুর হাউজিং সোসাইটিগুলো, উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনের বড় অংশজুড়ে গ্যাসের চাপ কম কিংবা একেবারেই থাকছে না। কোথাও কোথাও ভোর বা গভীর রাতে কয়েক ঘণ্টার জন্য চুলা জ্বললেও তা দিয়ে স্বাভাবিক রান্না সম্ভব হচ্ছে না। এতে অনেক পরিবার একবেলার জন্য রান্না করতেই হিমশিম খাচ্ছে।
গোপীবাগ তৃতীয় লেনের বাসিন্দা হাসনাত করিম জানান, গত প্রায় একমাস ধরে বাসার গ্যাসের লাইনে একেবারেই সরবরাহ থাকে না। দিনের বেলায় তো চুলাও জ্বলে না। এই অবস্থায় বাসায় রান্নাবান্না নিয়ে খুবই অসুবিধায় আছি। মাঝে মধ্যে হোটেল থেকে খাবার কিনে এনেও খেতে হচ্ছে।
মানিকনগর মিয়াজান লেনের বাসিন্দা সেলিনা খানম জানান, দিনের বেলায় চুলা জ্বালানোর মতো গ্যাসও লাইনে থাকে না। রাত ১১টার পর গ্যাস আসে, কিন্তু ভোর ৫টার দিকেই আবার চলে যায়। রাত জেগে রান্না করে সারা দিন খেতে হচ্ছে। কিন্তু বাসায় দুটি বাচ্চা আছে, তাদের তো আর এই শীতের মধ্যে রাতে রান্না করা ঠান্ডা খাবার দিনে খাওয়ানো যায় না। তাই বাধ্য হয়ে ইলেক্ট্রিক চুলায় তাদের জন্য রান্না করতে হচ্ছে।
মিরপুর ১০ নম্বরের বাসিন্দা রেবা রেহানা বলেন, ঘরে অসুস্থ মা আছে। পরিবারের সদস্যদের জন্য রান্না ছাড়াও মায়ের জন্য গরম পানি করাসহ বিভিন্ন কাজে গ্যাস প্রয়োজন হয়। সংসারে নানা কাজের পাশাপাশি চুলা ধরে গভীর রাত পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকা সম্ভব হয় না, এ কারণে তিন বেলা রান্না করে খাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বাইরে থেকে খাবার কিনে এনে ক্ষুধা নিবারণ করতে হচ্ছে। আবার হোটেলেও গ্যাস সংকটের কারণে তারাও খাবারের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।
যাত্রাবাড়ীর কাউন্সিলর বড়বাড়ী এলাকার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালক রিপন আহমেদ বলেন, ভোর হতে না হতেই গ্যাসের চাপ কমে যায়। সারা দিন আর আসে না। প্রতিদিন রান্না করার জন্য না ঘুমিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। রাত ১২টা থেকে ১টার মধ্যে চুলা জ্বলে।
এদিকে তিতাসের তথ্য বলছে, সিস্টেম লসের কারণে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যত গ্যাস অপচয় হয়েছে, তা দিয়ে ৩০ লাখ চুলায় টানা এক বছর তিন বেলা রান্না করা যেত। গত অর্থবছরে দেশে প্রায় এক হাজার ৭৯৬ মিলিয়ন ঘনমিটার (এমএমসিএম) গ্যাস অপচয় হয়েছে। খুচরা পর্যায়ে গ্যাসের গড় বিক্রয়মূল্যের হিসেবে, এই অপচয়ের আর্থিক ক্ষতি প্রায় চার হাজার ১০৭ কোটি টাকা।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ বলেন, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কমে গেছে। গত বছরের তুলনায় দিনে ২৫ কোটি ঘনফুট কম উৎপাদন হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে সরবরাহে। আবার শিল্পের উৎপাদন ঠিক রাখতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের চেষ্টা করা হচ্ছে। এতে আবাসিকে সংকট বাড়ছে।
তিনি বলেন, শীতকালে এমনিতেই গ্যাসের চাপ কম থাকে। এর ওপর উৎপাদন কমে যাওয়ায় সামগ্রিক প্রভাব পড়েছে সবক্ষেত্রে। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন না বাড়ালে এ সংকট নিরসন হবে না। এজন্য প্রয়োজন নতুন নতুন গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কার করা। এছাড়া পুরোনো কূপগুলোও সংস্কার করে উৎপাদন বাড়ানো যেতে পারে।
(এই ওয়েবসাইটের যেকোনো কিছু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি)
© 2026, এশিয়ান অনলাইন টিভি  |  সর্বস্বত্ব সংরক্ষিতDeveloped by Future IT
Recent comments
Latest Comments section by users
No comment available