ডেস্ক রিপোর্ট: ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অন্তত ৪ হাজার ২২৬ বাংলাদেশি নারী পারিবারিক কিউ-১ ভিসায় চীনে গেছেন। এর মধ্যে ২০২৫ সালেই গেছেন ১ হাজার ৭২১ জন। সম্প্রতি ভুয়া বিয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশি নারীদের চীনে পাচারের অভিযোগ সামনে আসার পর এই পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়েছে।
২২ আগস্ট শনিবার ঢাকায় ব্রিটিশ হাইকমিশনের সহায়তায় এবং মানবপাচার প্রতিরোধে কাজ করা সংস্থা জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার বাংলাদেশ আয়োজিত এক কর্মশালায় নারীদের চীনে যাওয়ার এই তথ্য তুলে ধরা হয়।
কর্মশালায় উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে কিউ-১ ভিসায় ৬৯ জন বাংলাদেশি নারী চীনে যান। ২০২১ সালে এ সংখ্যা কমে ৭ জনে দাঁড়ায়। ২০২২ সালে যান ৩৫ জন। এরপর ২০২৩ সালে হঠাৎ করে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ১৬ জনে। ২০২৪ সালে ১ হাজার ৩৭৮ এবং ২০২৫ সালে ১ হাজার ৭২১ নারী একই ভিসায় চীনে যান।
বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বিদেশি নাগরিকদের সঙ্গে বিয়ের বিষয়টি কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই করতে একটি প্রস্তাবিত মানসম্মত কার্যপদ্ধতি বর্তমানে আইন মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনায় রয়েছে।
পুলিশের বিশেষ শাখার কর্মকর্তারা জানান, প্রস্তাবিত কার্যপদ্ধতিতে বিদেশি নাগরিকদের সঙ্গে বিয়ের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কিছু কাগজপত্র জমা ও যাচাইয়ের শর্ত রাখা হয়েছে। খসড়া অনুযায়ী, বিদেশি নাগরিককে বৈধ পাসপোর্ট ও ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে অবস্থান করতে হবে। অন-অ্যারাইভাল ভিসা গ্রহণযোগ্য হবে না।
বিয়ের আগে বিদেশি নাগরিককে নিজ দেশের স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অবিবাহিত সনদ সংগ্রহ করে বাংলাদেশের দূতাবাস বা হাইকমিশন থেকে তা সত্যায়িত করে জমা দিতে হবে। বিয়েটিও অনুমোদিত কাজী বা নিবন্ধন কর্মকর্তার মাধ্যমে নিবন্ধিত হতে হবে। পার্বত্য তিন জেলার ক্ষেত্রে স্থানীয় জেলা পরিষদের নিয়ম অনুসরণ করে বিয়ে নিবন্ধনের কথা বলা হয়েছে।
প্রস্তাবিত কার্যপদ্ধতিতে ধর্মীয় ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিয়ের বিষয়েও নির্দিষ্ট বিধান রাখা হয়েছে। নিবন্ধনের পর বিবাহ সনদ প্রথমে নোটারি পাবলিক এবং পরে আইন মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সত্যায়িত করার প্রস্তাব রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরেই বিয়ের প্রলোভনে বাংলাদেশি নারীদের পাচারের বিষয়ে উদ্বেগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সুবিধাবঞ্চিত, প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নারীদের লক্ষ্য করছে পাচারকারী চক্র। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর নারীসহ অন্যান্য প্রান্তিক নারীদের চীনা নাগরিকদের সঙ্গে বিয়ের ব্যবস্থা করে পাচারের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
রাঙামাটির এক চাকমা নারী ২০২৪ সালে এ বিষয়ে মামলা করেন। অভিযোগে তিনি জানান, তার ২১ বছর বয়সী বোনকে ঢাকায় নিয়ে জোর করে এক চীনা নাগরিকের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়। খাগড়াছড়ির ২১ বছর বয়সী এক মারমা নারীও পৃথক অভিযোগে জানান, তাকে এক চীনা নাগরিককে বিয়ে করতে বাধ্য করা হয়েছিল।
চলতি আগস্টে বাগেরহাটের ১৯ বছর বয়সী এক নারী অভিযোগ করেন, তাকে চেতনানাশক খাইয়ে আপত্তিকর ভিডিও ধারণ করা হয়। পরে ওই ভিডিও দেখিয়ে তাকে ভয় দেখিয়ে এক চীনা নাগরিকের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে তাকে চীনে নিয়ে যাওয়ার পর শারীরিক নির্যাতন ও যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার অভিযোগ করেন তিনি। জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ারের সহায়তায় গত ৪ আগস্ট তিনি দেশে ফেরেন।
এদিকে ঢাকায় চীনা দূতাবাসও অবৈধ ঘটকালি চক্রের বিষয়ে সতর্ক করেছে। গত ১৪ জুলাই এক বিজ্ঞপ্তিতে চীনা নাগরিকদের সতর্ক করে দূতাবাস জানায়, অবৈধভাবে কনে কেনার এ ধরনের আয়োজন মানবপাচার, চাঁদাবাজি, হুমকি, শারীরিক ক্ষতি ও আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
এর আগে বাংলাদেশে চীনা দূতাবাসের কাউন্সেলর চু গুয়াং জানিয়েছিলেন, পারিবারিক ভিসার আবেদন কয়েক ধাপে যাচাই করা হয়। এর মধ্যে বিবাহ সনদের সত্যতা যাচাই, ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার এবং লিখিত অঙ্গীকারনামা নেওয়া হয়। এর মাধ্যমে বিয়েটি প্রকৃত কি না এবং আবেদনকারী স্বেচ্ছায় চীনে যাচ্ছেন কি না, তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়।
কর্মশালায় ইমিগ্রেশনের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আবু নোমান বলেন, অপরাধী চক্রগুলো ভিসা পাওয়ার জন্য ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে প্রক্রিয়াটির অপব্যবহার করছে। সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের সুরক্ষায় ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ বেশ কিছু ব্যবস্থা নিয়েছে বলেও জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ বলেন, এ ধরনের পাচার আন্তঃদেশীয় সংঘবদ্ধ অপরাধ। এ বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, চলতি বছর পাস হওয়া মানবপাচার আইনে আন্তর্জাতিক প্রটোকলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অভিবাসন প্রক্রিয়ায় পাচারের বিষয়টি পৃথক অধ্যায় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক ও তদন্ত কর্মকর্তাদের ক্ষমতাও বাড়ানো হয়েছে।
তিনি বলেন, আগে পাচার-সংশ্লিষ্ট ধর্ষণ ও হত্যার মতো অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারের বাইরে ছিল। এখন এসব অপরাধকে আনুষঙ্গিক অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে ট্রাইব্যুনালের বিচারকরা বিচার করতে পারবেন।
সূত্র: ডেইলি স্টার অনলাইন
(এই ওয়েবসাইটের যেকোনো কিছু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি)
© 2026, এশিয়ান অনলাইন টিভি  |  সর্বস্বত্ব সংরক্ষিতDeveloped by Future IT
Recent comments
Latest Comments section by users
No comment available