বাজিতপুর (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি: হাওরের দেশ কিশোরগঞ্জ। চারদিকে নদী, বিল আর জলাশয়ের বিস্তৃত জাল। অথচ, সেই জলরাজ্যেই আজ প্রশ্ন উঠছে, মাছ কোথায়? নিকলী ও বাজিতপুর উপজেলায় প্রচুর নদ-নদী ও হাওর থাকা সত্ত্বেও নেই কোনো স্থায়ী মৎস্য অভয়াশ্রম। ফলে দিন দিন কমে যাচ্ছে দেশি মাছের প্রজাতি, সংকটে পড়ছে হাওরের জীববৈচিত্র্য।

স্থানীয় মৎস্যজীবী ও পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, অভয়াশ্রম না থাকায় মা মাছ ও পোনার নিরাপদ আশ্রয় নেই। এতে মাছের বংশবিস্তার ব্যাহত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে হাওরাঞ্চলে মাছের অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।


মৎস্য অভয়াশ্রম হলো নদী, বিল, হাওর বা জলাশয়ের এমন একটি নির্দিষ্ট এলাকা, যেখানে মাছের নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করতে স্থায়ী বা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকে। এসব এলাকায় মা মাছ নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়ে, পোনা বড় হওয়ার সুযোগ পায় এবং জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদের স্বাভাবিক ভারসাম্য বজায় থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অভয়াশ্রমের অভাবে মা মাছ নিরাপদে ডিম ছাড়তে পারে না। ফলে মাছের উৎপাদন কমে যায় নাটকীয়ভাবে। অতিরিক্ত ও অবাধ আহরণের কারণে অনেক দেশি প্রজাতির মাছ ইতোমধ্যে বিলুপ্তির পথে। পোনা মাছ নিধনের ফলে বড় মাছের সংকট তৈরি হচ্ছে, কমছে মাছের গুণগত মান। এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের পুষ্টি ও প্রোটিন সরবরাহেও। সহজ কথায়, মাছের ভবিষ্যৎ টিকিয়ে রাখতে অভয়াশ্রম এখন সময়ের দাবি।
বাজিতপুর উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নদী। এর মধ্যে রয়েছে— মেঘনা, ঘোড়াউত্রা, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, কালনী, ধলেশ্বরী ও কূলা নদী। একসময় এসব নদী ছিল মাছের স্বর্গরাজ্য। ঘোড়াউত্রা নদীর তীরে অবস্থিত দিলাপুলর নদীবন্দর ছিল ঐতিহ্যের অংশ, যা আজ প্রায় বিলুপ্ত। নদী থাকলেও নেই মাছ সংরক্ষণের কোনো কার্যকর উদ্যোগ।
হাওরবেষ্টিত নিকলী উপজেলা নদ-নদীর জালের মতো বিস্তৃত। ঘোড়াউত্রা, সোয়াইজনী, ধনু, নরসুন্দা, বৌলাই ও সুরমা-বাউলা নদী এই উপজেলার জলপ্রবাহের প্রধান অংশ। অথচ, এত নদী থাকা সত্ত্বেও একটি স্থায়ী মৎস্য অভয়াশ্রমও নেই, যা স্থানীয়দের হতাশা আরও বাড়িয়েছে।
স্থায়ী অভয়াশ্রম না থাকায় ডিমওয়ালা মাছ ও পোনা অবাধে নিধন হচ্ছে। কারেন্ট জাল ও চায়না দুয়ারি জালের মতো ক্ষতিকর সরঞ্জামের ব্যবহার বেড়ে গেছে। এতে মাছের প্রজনন মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি নদী ও বিলের নাব্যতা হ্রাস, পলি জমে যাওয়া এবং প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
মৎস্য কর্মকর্তারা জানান, মাছের উৎপাদন বাড়াতে স্থানীয় চাষিদের প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। তবে নিকলী ও বাজিতপুরে স্থায়ী মৎস্য অভয়াশ্রম স্থাপনের বিষয়টি এখনো প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে।
হাওরবাসীর দাবি, নদী ও গুরুত্বপূর্ণ বিলগুলোতে দ্রুত স্থায়ী মৎস্য অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হোক। তা না হলে হাওরের ঐতিহ্যবাহী দেশি মাছ শুধু গল্পেই সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে।
(এই ওয়েবসাইটের যেকোনো কিছু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি)
© 2026, এশিয়ান অনলাইন টিভি  |  সর্বস্বত্ব সংরক্ষিতDeveloped by Future IT
Recent comments
Latest Comments section by users
No comment available